অনিরাপদ মাদ্রাসায় নেই সরকারি নজরদারি

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৯ ৭:৪৭:১৭ অপরাহ্ণ

মাহমুদ: বাংলাদেশে হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে কোনো সরকারি নজরদারি নেই। ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি দুর্বৃত্তের দেয়া আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন মৃত্যুর কাছে। আলোচিত এই ঘটনার মাঝেই গত বুধবার রাতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামী থানায় একটি মাদ্রাসা থেকে ১১ বছর বয়সী একজন ছাত্রের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছে যে, মাদ্রাসার একজন শিক্ষক শিশুটিকে অনেক মারধোর করেছিলেন। এছাড়া দু’দিন আগে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় দু’জন কিশোরকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সেখানে মামলা হয়েছে।

এসব ঘটনার প্রক্ষাপটে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।  আসলে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় মনিটরিং বা তদারকির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

বাস্তবতা হলো, সরকার নিয়ন্ত্রিত আলিয়া ও এবতেদায়ী মাদ্রাসায় তদারকির ঘাটতি। আর কওমী মাদ্রাসায় তদারকির কোনো ব্যবস্থাই নেই।
পরিচালনায় যারা থাকেন, বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসায় একক কর্তৃত্ব। মাদ্রাসাগুলোতে ঐ ধরণের কোনো নজরদারি না থাকাতে কেউ সেখানে দায়িত্ব নিয়ে দেখভাল করে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে পুরোপুরি সরকারি তিনটি আলিয়া মাদ্রাসা আছে। আর নয় হাজারের মতো আলিয়া এবং এবতেদায়ী মাদ্রাসা আছে সরকারি এমপিও ভূক্ত। এর বাইরে সরকারি স্বীকৃত মাদ্রাসা আছে হাজার তিনেক। নিয়ন্ত্রণহীন কওমী মাদ্রাসার সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি।

এ সকল মাদ্রাসায় সরকারিভাবে তদারকি করতে দেখা যায় না। এছাড়া জবাবদিহিতা না থাকায় সব ধরণের মাদ্রাসা থেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠছে। সরকারি তত্বাবধানে পরিচালিত হয় আলিয়া এবং এবতেদায়ী মাদ্রাসা। যদিও সেখানে সরকারের মনিটরিংয়ের দূর্বলতা প্রকট। এর বাইরে গড়ে ওঠা হাজার হাজার মাদ্রাসা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্বেও কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সেগুলো আসতে চায় নি।

দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো যে হারে মাদ্রাসা বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না শিক্ষার মান। এছাড়া আমাদের সমাজের অনেক ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের পর শেষ বয়সে সমাজে সেবক সেজে গ্রামে একটি মাদ্রাসা অথবা এতিম খানা গড়ে তোলেন। ভাবেন, পরকালে হয়তো এর উসিলাম সকল কুকর্ম থেকে নিস্কৃতি পাবেন। আর এ সকল প্রতিষ্ঠানে যারা পড়তে যাচ্ছে তাদের পিতা-মাতাও স্বল্প আয়ের মানুষ হওয়ায় সন্তানকে একটি দুঃসহ পরিবেশে ঠেলে দিচ্ছেন। কঠোর শাসনের জন্য অভিভাবকের কাছেও কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় অনেক সময় সেই শাসন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। আর এমন বাড়াবাড়িতে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। এছাড়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দেখা যায় চাঁদার রসিদ হাতে চাঁদা তুলতে, গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে চাল বা সাহায্য আদায় করতে। এর ফলে সমাজ প্রত্যক্ষভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে।

সরকারকে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। বর্তমানে সরকার যে হারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিচ্ছে, অবৈতনিক শিক্ষা প্রচলন, বৃত্তি, উপবৃত্তি সহ মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে- এ বিষয়টিকে জনগণের মাঝে আরো ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল মাদ্রাসাকে একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালার আওতায় আনতে হবে। কারণ, এখন দেখা যাচ্ছে প্রায় গ্রামেই এক বা একাধিক মাদ্রাসা গড়ে ওঠেছে, ভবিষ্যতে হয়ত সেটি মহল্লায় বা পাড়ায় গড়ে ওঠবে। আর এমনটি হতে থাকলে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল রেখে প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাই পড়বে হুমকির মুখে। সেই সাথে আগামীর ভবিষ্যত এদেশের সম্ভাবনাময় কিশোরদের অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে, যা সমাজের জন্য অবশ্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।

আরও পড়ুন: নুসরাত হত্যার আসামি নূর উদ্দিন গ্রেফতার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়