শিরোনাম

অপরাজিতা (মিষ্টি প্রেমের গল্প)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, এপ্রিল ১৩, ২০১৯ ১০:১১:১৭ অপরাহ্ণ
Love story

অপরাজিতা
মাহ্‌মুদুন্নবী জ্যোতি

(এক)
-হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালেকুম আসসালাম।
-এটা কি জিরো ওয়ান সিক্স……………..জিরো।
-জ্বী নাম্বার ঠিক আছে। কাকে চান?
-জ্বী আপনাকে। আপনি ভালো আছেন?
-হ্যাঁ ভালো। আপনি কে বলছেন?
-না, মানে, আপনি আমাকে ঠিক চিনবেন না।
-যদি নাই চিনি তাহলে কথা বলছেন কেন?
-আমি কি আপনাকে ডিসটার্ব করলাম?
-দেখুন, এখন রাত আড়াইটা। ভোর সাতটায় উঠতে হবে আমাকে। কাঁচা ঘুমটা ভেঙেছেন, পরিচয় দিচ্ছেন না, আবার বলছেন ডিসটার্ব করলেন কিনা।
-স্যরি, আমি তাহলে রাখি।
-আপনি না রাখলেও আমিই রেখে দিতাম, গুড নাইট।

(দুই)
-হ্যালো
-হ্যালো
-জ্বী আপনি কি হিমেল বলছেন?
-জ্বী বলছি।
-আপনি ভালো আছে?
-জ্বী ভালো আছি। আপনি কে বলছেন?
-আপনি জিজ্ঞেস করলেন না কেন আমি কেমন আছি?
-দেখুন, মেয়ে কণ্ঠস্বর শুনলেই যে আমি আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাবো এমনটি ভাবার কোন কারণ নেই। তাছাড়া আপনি কাল রাতেও ফোন করেছিলেন, কিন্তু পরিচয় দেননি।
-হ্যা করেছিলাম। প্রয়োজনটা যেহেতু মিটে নাই, তাই আবারো বিরক্ত করছি।
-দেখুন আমি বিরক্ত হচ্ছি কি হচ্ছি না সেটা বড় কথা না। আমার এ মূহুর্তে আপনার পরিচয়টা জানতে ইচ্ছে করছে।
-কেন ইচ্ছে করছে?
-জানি না। তবে যদি আপনি আপনার পরিচয়টা না দেন তবে আমি ফোন রাখতে বাধ্য হবো।
-ঠিক আছে। আজকে আর বিরক্ত করবো না। কারণ, আপনার সামনে এখন মোড়ক পোলাও, যা আপনার খুব প্রিয়।
-জ্বী…
-আপনার শার্টের সাথে কিন্তু টাইটা বেশ মানিয়েছে।

(তিন)
-কী ব্যাপার বার বার লাইন কেটে দিচ্ছেন কেন?
-আমার ইচ্ছে। অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না তাই লাইন কেটে দিচ্ছি।
-এটা কিন্তু ঠিক না। তাছাড়া আমার প্রয়োজনের কথা এখনও তো আপনাকে বলা হয়নি।
-ঠিক আছে। এবার দয়া করে প্রয়োজনটা বলে ফেলুন।
-নাহ্ থাক আজকে বলবো না।
-ঠিক আছে না বললেন। তাহলে পরিচয়টা দিন।
-না ওটাও আর আজকে দেয়া যাবে না। ও হ্যাঁ, সবুজ টিশার্টে আপনাকে কিন্তু দারুণ লাগছে।
-কি করে বুঝলেন?
-আমি বুঝতে পারি।
-আচ্ছা ঠিক আছে আপনি আপনার বুঝতে পারা নিয়ে থাকুন। আমি রাখছি, বাই।

(চার)
-কী ব্যাপার, আপনার কোন কাজ নেই নাকি। নাকি আমাকে বিরক্ত করার জন্য কারো কাছ থেকে ঠিকাদারি নিয়েছেন।
-ফোনটা ধরলেন তো সতের বারের মাথায়। আর ধরেই উল্টো বলা শুরু করলেন। আপনার কি মন খারাপ?
-আপনি তো সব জানতে পারেন। আমার সামনে মোরক পোলাও, শার্টের সাথে টাই মানিয়েছে, সবুজ টিশার্টে দারুণ লাগছে, তাহলে আপনিই বলুন আমার মনটা ভালো নাকি খারাপ।
-আপনার মনটা ভালোই আছে।
-মানে…
-আপনার তো আর ক’দিন পরইতো বিয়ে। বিয়ের আগে তো ছেলেরাই ভালো থাকে। সেদিক থেকে আপনার ভালোই থাকার কথা।
-আচ্ছা আপনি কে বলুন তো।
-বলবো, তবে তার আগে আপনি বলুন তো, আপনার বিয়ের খবর কি ‘শীলা’ জানে?
-জ্বী-
-কী ব্যাপার কথা বলছেন না কেন?
-শীলা!
-হ্যাঁ শীলা। আপনার বান্ধবী। আপনাকে যে জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। ও জানে আপনার বিয়ের খবর।
-তার আগে যদি আপনার পরিচয়টা দেন, তবে…
-আমি কানিজ। শীলার বান্ধবী। আমরা একই সাথে লন্ডনে পড়াশোনা করেছি।
-ও কেমন আছে? ও কি দেশে ফিরেছে?
-উত্তর নম্বর এক, ও ভালো আছে। উত্তর দুই, দেশে ফিরেছে।
-ওরা তো আগের বাসায় নেই, কোথায় উঠেছে বলতে পারেন।
-না, তাতো বলতে পারবো না। কারণ শীলা মানা করেছে।
-ও, আচ্ছ ঠিক আছে।
-কী ঠিক আছে? একটা মানুষকে আপনি নিজে তিলে তিলে হত্যা করছেন আর বলছেন ঠিক আছে।
-আমি তা বলিনি। অনেক দিন হলো দেখা হয়না তো তাই।
-ঠিকানা পেলে দেখা করতে যাবেন। নাকি যে মেয়েটি আপনাকে এত ভালোবাসলো তাকেই নিজের বিয়ের দাওয়াত দিতে যাবেন।
-ঠিক তা না।
-তাহলে।
-আমার আর এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে। রাখি।

(পাঁচ)
-হ্যালো, কি খবর?
-জ্বী ভালো।
-মিথ্যে বলছেন কেন।
-মিথ্যে বললাম কোথায়।
-এই যে বললেন ভালো আছি।
-আপনি আমার কাছে এখনো অপরিচিত। আমার ভালো-মন্দের খবর আপনাকে জানাবো কেন?
-সেটা ঠিক।
-তিনদিন পর ফোন করলেন এবার।
-হ্যাঁ, ইচ্ছে করেই তিনদিন পর করলাম। দেরি করছিলাম এই ভেবে যে, দেখি আপনি শীলার খবর জানার জন্য আমাকে ফোন করেন কিনা। কিন্তু করলেন না। আপনি সত্যিই একটা স্বার্থপর।
-শীলাও আমাকে একথাটি বহুবার বলেছে।
-মনে আছে এখনো ওর কথা।
-মনে থাকবে না কেন। অনেক স্মৃতিইতো মিশে আছে অন্তরে। অদেখা বসতি হয়ে স্থায়ী আবাস গড়েছে যে মানুষটি, তাকে কী আর এতো সহজেই ভোলা যায়? যায় না।
-আপনি কি এখনো শীলাকে ভালোবাসতে পারেননি?
-দেখুন কানিজ, আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কখনো কারো সাথে শেয়ার করতে পারিনি, এখনো পারিনা। কেন পারিনা সেটা আমার দুর্বলতা। ভালোলাগা, ভালোবাসা এসবই মনের ব্যাপার। তাছাড়া…
-তাছাড়া কি?
-ভালোবাসার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক বিষয়টিও ভূমিকা রাখে।
-বুঝলাম না।
-শীলা আমার ব্যপারে সবকিছুই জানতো । তারপরও ও আমাকে পছন্দ করতো। কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসার বদলে ভয়ই পেতাম বেশি। কারণ, আমার বিধবা মায়ের কষ্টার্জিত অর্জন বলতে ছিল কেবলই আমার সাবলম্বী হওয়া। অনেক কষ্টের জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে আমাদের। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে যেখানে বৃদ্ধা মায়ের আতঙ্কিত মুখটি চোখে ভাসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনের টাকায় যখন মায়ের ঘামের গন্ধ ভেসে আসত, সেখানে প্রেমের মানুষটির অবয়ব চোখের সামনে ভেসে উঠবে সেটা ছিল আমার কাছে কল্পনাতীত।
-আমার জানামতে ও আপনার সকল কষ্টের সঙ্গী হতে চেয়েছিল।
-হ্যাঁ চেয়েছিল সত্যি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে বিত্তশালীর মেয়ের আবেগ প্রবণতা। ভেবেছি আবেগে অনেক মেয়েই তো অনেক কথাই বলে থাকে। শীলাও হয়ত তাই…। সবচে বড় কথা হলো, মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের কথা বলার সাহস আমার ছিল না। যে মা নিজে বিয়ের দুই বছরের মাথায় বিধবার শাড়ী পড়ে শুধু আমাকে নিয়ে কঠিন সময় পাড় করলেন, নিজের সকল পছন্দ-অপছন্দ জলাঞ্জলি দিলেন, সেই মায়ের কাছে নিজের পছন্দের কথা বলার মত দু:সাহস আমার কখনোই ছিল না এখনো নেই।
-যাকে বিয়ে করছেন, সে কেমন?
-জানি না।
-মানে, তাকে দেখেননি?
-না, আমার দেখার সময় হয়নি।
-ছবিও দেখেননি?
-ইচ্ছে করেনি।
-তাহলে…
-মা দেখেছেন। আমাকে ছবি দেখাতে চেয়েছিলেন, আমি দেখতে চাইনি।
-কি করে মেয়েটি।
-শুনেছি বিদেশে কি একটা ডিগ্রী নিয়েছে। তার আগে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়েছে।
-কি নাম সেই ভাগ্যবতীর?
-নীলু নাকি শীলু কি যেন বলেছিল ঠিক মনে করতে পারছি না।
-অদ্ভুত মানুষ তো আপনি? বিয়ে করবেন অথচ মেয়েটি সম্পর্কে আপনার কোন ধারণাই নেই। সামনা-সামনি দেখেননি, ছবিও দেখেননি, এমনকি নামটা পর্যন্ত ভুলে বসে আছেন। আচ্ছা পরিবার সম্পর্কে জানেন কিছু?
-শুনেছি ঢাকায় থাকে। কানিজ, সত্যি কথা বলতে কি, এমূহুর্তে আমার আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না।
-আচ্ছা ঠিক আছে। শুধু এটুকু বলুন, যাকে আপনি দেখলেন না, চিনলেন না, তাকে আপনি বিয়ে করবেন কীভাবে?
-কানিজ, আমি আমার মাকে কেমন ভালোবাসি তা বোধহয় আপনার বুঝতে বাকি নেই। আমার মা সব সময় আমার ভালো চেয়েছেন। বাসর রাতে বিয়ে করা বউকে আমার মায়ের দেয়া শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবেই ধরে নিব। এর চেয়ে বেশি কিছু আর বলতে চাই না।
-সত্যি আপনি অনেক ভালো একজন মানুষ।
-কানিজ, আপনার সাথে শীলার কথা হলে বলেন, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে মায়ের পছন্দে। বিয়ের সময় ছেলেরা আনন্দিত হলেও আমার বেলায় উল্টো হয়েছে। কষ্ট অনুভব করছি।

(ছয়)
-হ্যালো…
-এই প্রথম আপনি আমাকে ফোন করলেন। বাড়ি কখন পৌঁছালেন? আপনার মা কেমন আছেন?
-আমি তো আপনাকে বলিনি যে আমি বাড়ি যাচ্ছি, জানলেন কি করে?
-কি করে জানলাম, সেটা পড়ে জানলেও চলবে। আপনার মা কেমন আছেন?
-হ্যাঁ, এখন ভালো। জানেন, আমার মায়ের একটা অদ্ভূত অসুখ আছে। আমাকে না দেখার অসুখ। এক মাস আমার সাথে দেখা না হলেই অসুস্থবোধ করেন। ডাক্তার ওষুধ কোন কিছুতেই কাজ হয় না। আমি মায়ের সামনে এলেই আর কোন অসুখ থাকে না, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান তিনি।
– কি করছেন এখন?
-চুলার পাশের বসে আছি। মা হাঁসের মাংস রান্না করছেন? এরপর চালের গুড়ার রুটি বানাবেন। চুলার পাশে বসেই খাবো। জানেন, মাটির চুলায় মাটির হাড়িতে রান্না করা খাবারেই মজাই আলাদা।
-হ্যাঁ, শীলা বলেছিল। মায়ের দেয়া আপনার প্রিয় ঐ খাবারটি নাকি একবার ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। খবর পেয়ে শীলা আপনার মেসে গিয়েছিল। খুব মজা করে খেয়েছিল আর প্রশংসাও করেছিল।
-হ্যাঁ। সত্যি বলেছে। আসলে, শীলা অনেক ভালো একটি মেয়ে বলেই ঠান্ডা তরকারি এবং শক্ত পিঠা খেয়েও প্রশংসার ফুলঝুড়ি ঝড়েছিল ওর কন্ঠে।
-আপনার মাকে নিয়ে ঢাকা আসছেন কবে? বিয়ের তো আর বেশি দেরি নেই। আর মাত্র নয় দিন বাকি।
-দু’টা থাকবো বাড়িতে। তারপর।
-সময় কম হয়ে যাচ্ছে না।
-শীলা কি জানে বিষয়টা।
-আমি বলেছি।
-কি বলল?
-তেমন কিছু না।
-জানেন, ওর সাথে যখন আমার শেষ দেখা হয়, তখন একটা কথা খুব দৃঢ়ভাবে বলেছিল।
-কি?
-বলেছিল, ও নাকি ওর প্রেমকে মরতে দেবে না। ওর যাকে পছন্দ তাকেই সে বিয়ে করবে। জীবনে নাকি ও কখনো হারতে শেখেনি। যদি বাঁচতে হয় তাহলে নাকি ‘অপরাজিতা’ হয়েই বাঁচবে।
-তখন আপনি কি বলেছিলেন?
-এমন কথার বিপরীতে কি বলতে হয়, তা আমার জানা ছিল না।
-ওকে কী আপনার এখনো খুব মনে পড়ে?
-আমি নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু মা’র জন্য তা আর হয়ে উঠলো না। একটা কথা কিন্তু এখনো জানা হলো না।
-কি?
-শীলা কী বিয়ে করেছে?
-না, তবে খুব শীঘ্রই করবে বলে জানালো।
-ভালোই হলো। শীলা যার ঘরে যাবে, সে ঘরটা আলোয় ভরে থাকবে সারাক্ষণ।
-কী করে বুঝলেন?
-এতটুকু বোঝার মত জ্ঞানতো হয়েছে নাকি? কানিজ, এখন রাখি, পরে কথা হবে কেমন।
-কী ব্যাপার মন খারাপ হয়ে গেল বুঝি?
-নাহ্ মন খারাপের কি আছে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, কখনো কখনো মনটা অবাধ্য হয়ে যায়, নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। তখন নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হয়। এবার রাখি তাহলে। ভালো থাকবেন।

(সাত)
-হ্যালো
-হ্যাঁ কানিজ বলুন?
-এতক্ষণে আপনার ফোন ধরার সময় হলো।
-কেন কি হয়েছে?
-কি হয়নি তাই বলুন?
-আহা, না বললে বুঝবো কি করে?
-শীলা…
-কী হয়েছে শীলার?
-বেচারির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
-ভালোই তো হয়েছে। এতে আর মন খারাপ করার কি আছে?
-হ্যাঁ আছে। আপনাকে শীলা যে কথা বলেছিল, তাই এখন সে পালন করতে যাচ্ছে।
-কী সব বলছেন, কী কথা, কী পালন করতে যাচ্ছে?
-ঐ যে আপনাকে বলেছিল যদি সে বাঁচে তবে ‘অপরাজিতা’ হয়েই বাঁচবে।
-হ্যাঁ, বাঁচবে। তাতে সমস্যা কোথায়?
-সত্যি কোন সমস্যা নেই?
-আমি তো কোন সমস্যা দেখছি না।
-আচ্ছা ঠিক আছে, এবার বাসার গেটটা খুলুন।
-কী আশ্চর্য, বাসার গেট খুলতে হবে কেন?
-আগেই খুলুনই না।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
গেট খুলতেই- শীলা তুমি? তোমার কানে ফোন, আমার কানে… তার মানে-
-হ্যাঁ, তার কোনো মানে নেই। তোমাকে বলেছিলাম আমি যদি বাঁচি তাহলে অপরাজিতা হয়েই বাঁচবো। মনে আছে তোমার?
-শীলা, মা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন। আর ক’টা দিন পরই আমার বিয়ে। প্লিজ পাগলামী করো না।
-আচ্ছা ঠিক আছে, শুধু একটিবার বলো, তুমি আমাকে ভালোবাস কিনা? উত্তরটা শুনেই আমি চলে যাবো।
-হ্যাঁ, বাসি। সত্যিই ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। এবার যাও।
-তাহলে তো কোন ঝামেলাই নেই।
-কি ঝামেলা নেই। দ্যাখ বাসায় মা আছেন। প্লিজ ঝামেলা করো না।

কে রে খোকা বলতে বলতেই মা ড্রইং রুমে প্রবেশ করেন। ও শীলা মা। তুমি কখন এলে? আমাকে ডাকনি কেন? এসো এসো তোমার কথাই ভাবছিলাম। তোমার আঙুল আর হাতের মাপটা এখনো নেয়া হয়নি। দাওতো মা মাপটা। আজ বিকেলেই জুয়েলারিতে দিয়ে আসতে হবে।

হিমেল হাবাগোবা চেহারা করে বেকুবের মত একবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার শীলার দিকে তাকাচ্ছে। কী হচ্ছে, আর কী হতে চলেছে তার মাথামুন্ড কিছুই বুঝতে পারছেনা। মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরে হিমেলের। শোন খোকা। শীলার সাথেই তোর বিয়ে ঠিক করেছি।

তখনো ঘোরের মধ্যে হিমেল। শুধু জ্বী বলেই উত্তর শেষ করে। মা বলেন, শীলার কথা তুই আমাকে কখনো বলিসনি। বিয়ের কথা বললেই তুই আজ-কাল করে করে সময় পার করেছিস। আমিও জানতে চাইনি তোর পছন্দের কেউ আছে কিনা। এর মাঝে হঠাৎ একদিন শীলা আর ওর বাবা আমাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। শীলার মায়াভরা চেহারা দেখে আর আমার প্রতি তোর অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণ সেদিন আমাকে আনন্দাশ্রুতে ভাসিয়েছিল রে খোকা। আমি আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। ঐদিনই আমি পাকা কথা দিয়েছিলাম। আর তোর সাথে যে শীলা কানিজ সেজে কথা বলেছে, তাও আমাকে জানিয়েছে।

-কিন্তু আমি তো তোমাকে জানাইনি, হিমেল জবাব দেয়। মা বললেন, তাও আমি জানি। কিন্তু এতে তুই কোনো অন্যায় করিসনি। বরং প্রমাণ করেছিস, তুই মায়ের প্রতি কতটুকু অনুগত। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি বাবা। মায়ের চোখে আনন্দের জল দেখা দিতেই আচলে তা মুছতে মুছতে বললেন, তোরা একটু বোস, আমি দেখি শীলার জন্য একটু মিষ্টির ব্যবস্থা করি।

মায়ের চলে যাওয়ার পর শীলা হিমেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, হিমেল, আমি সত্যিই তোকে অনেক ভালোবাসি। আমি চাইনি তুই অন্য কাউকে বিয়ে কর। আর কেন তোকে এত ভালোবাসি তা নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিস। কথাগুলো বলার সময় হিমেলের কোন ভাবাবেগ না দেখে, মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে, কিরে কথা বলছিস না কেন?

হিমেল যেন নিজেকে এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। সবকিছুই কেমন স্বপ্নের মত মনে হয়। তারপরও নিজেকে সামলে নেয় হিমেল। অনেকটা সাহসীও হয়ে উঠে। শীলার কাঁধে দু’হাত রাখে, চোখে চোখ রেখে বলে, আজ থেকে তুমি আর শীলা নও। অপরাজিতা। আমার অপরাজিতা। তোমার অজেয় অগ্রযাত্রায় আমাকে শুধু সাথী করে নিও।

লজ্জাবতী লতার মত নুইয়ে পড়ে শীলা। নিজের কাঙ্খিত বিজয়ে শব্দহীন হাসির রেখা ফুটে উঠে অবয়বে, চোখের কোণে আনন্দের জলকণা। ঠোট দু’টো কাঁপতে থাকে ক্রমাগত। নিজের অজেয় অগ্রাযাত্রায় হিমেলকে সাথে রাখবে-কথাটিও বলতে পারে না। শুধু আলতো করে হিমেলের বুকে মাথা রেখে সম্মতি জানায়।

আরও পড়ুন: জীবনের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়