আবাস হলেও সমস্যার সমাধান বহু দূরে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৪, ২০১৯ ৫:১৩:৫৩ অপরাহ্ণ

মাহমুদ: রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে সেখানে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, আশ্রয় কেন্দ্রসহ সব ধরনের অবকাঠামোর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে। বঙ্গোপসাগরে ১৩ হাজার একরের এই দ্বীপটির তিন হাজার একর জায়গার চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্যে একটি বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। লাগানো হয়েছে নারকেল সুপারিসহ বহু গাছপালাও।
প্রকল্পে যতো রাস্তা ও অবকাঠামো আছে সেগুলোর নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ১৪৪০টি ঘর বানানো হয়েছে, যার প্রতিটি ঘরে ১৬টা করে পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটা পরিবারে যদি চারজন করে সদস্য হয় তাহলে তাদের আলাদা একটা কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদের জন্য আলাদা রান্নাবান্না ও টয়লেটের সুবিধাও রাখা হয়েছে।

বন্যা বা জলোচ্ছাসের পানি ঠেকাতে বাড়িগুলো মাটি থেকে চার ফুট উঁচু করে বানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ঘরগুলোর কাজ প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রকল্পটির আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হল এখানে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে সব ধরণের সেবা দেয়া হচ্ছে। যেমন এখানে মানুষের উচ্ছিষ্ট থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই গ্যাস দিয়েই চলবে রান্নাবান্না। এছাড়া বিদ্যুতের জন্য সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।

প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেগুলো হল, ভূমি থেকে ৭২০ ফুট গভীর থেকে পানি উত্তোলন, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পর্যাপ্ত পুকুর। প্রত্যেক বাড়ির টিন থেকে পড়া বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হবে যাতে মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে সেই পানি ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া প্রতিটা ক্লাস্টারে ১২০টা পুকুর তৈরি করা হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবেলার বিষয়টি মাথায় রেখে এ অঞ্চলে চার তলা বিশিষ্ট ১২০টি সাইক্লোন সেন্টার বানানো হয়েছে। যার নীচতলা পুরো খালি থাকবে এবং প্রতিটি শিবিরে এক হাজার মানুষ জরুরি অবস্থায় আশ্রয় নিতে পারবে।তাছাড়া আশ্রয় কেন্দ্রগুলোও ভূমি থেকে ৪ ফুট উঁচু করে বানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ভূমি থেকে ভবনটির নীচতলার ছাদ ১৪ ফুট ওপরে। অর্থাৎ যদি কোন জলোচ্ছ্বাস ১৪ ফুটের ওপরে না আসে তাহলে কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা।

এই প্রকল্পটি শুরু করার আগে ভাসানচর বড় ঢেউ বা বন্যায় দুই থেকে তিন ফুট পানির নীচে চলে যেতো। কিন্তু এখন এমনটা হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। কেননা এই প্রকল্পের আওতায় ১৩ ফুট দীর্ঘ, ৯ ফুটের এমব্যাঙ্কমেন্ট বানানো হয়েছে বা পাড় বাঁধানো হয়েছে। যে অঞ্চলে এই মানুষগুলোর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে তাই পানি প্রবেশের কোন সুযোগ নেই।

এছাড়া এতোগুলো মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সার্বিক সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত, যে ১২০টি সাইক্লোন সেন্টার বানানো হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি বিকল্প কাজে ব্যবহারযোগ্য সাইক্লোন সেন্টার আছে। এই সেন্টারগুলো বাড়তি সেবার জন্য যেমন, প্রশাসন, পুলিশ, হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে। জানা গেছে, প্রতিদিন ৫০০জন রোহিঙ্গাকে সেখানে নেওয়া হবে। কারণ তাদেরকে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ভাসানচর এই রুট দিয়ে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে একসঙ্গে সবাইকে স্থানান্তর সম্ভব না।

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করলো তা বিশ্বের অন্যকোনো দেশ করেছে কিনা সন্দেহ আছে। এতোকিছু করার পর বিশ্ব দরবারে যে বার্তা গেল তা নিঃসন্দেহে মানবিক এবং অত্যন্ত প্রশংসনীয় হলেও সরকারের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কারণ, রোহিঙ্গা সমস্যার সমধানে কতিপয় দেশের আর্থিক সহযোগিতা হয়ত বাংলাদেশ পেয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের এই জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী দেশের সরকার প্রধানেরা শুধুমাত্র আশ্বাসই দিয়েছে, কার্যকরি কোনো পদক্ষেপ কাউকে নিতে দেখা যায়নি। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়