ইমাম হোসেন (রা.) এর আদর্শ আকড়ে ধরতে হবে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, আগস্ট ৯, ২০২২ ১১:৪৮:১৩ পূর্বাহ্ণ

পবিত্র মহরম হিজরি সনের প্রথম মাস। আরবি বছরের চারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মাসের মধ্যে এটি অন্যতম। এই মাসেই হজরত মহম্মদ ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেছিলেন। নিষিদ্ধ করেছিলেন যুদ্ধবিগ্রহ।

‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশরা’ শব্দের অপভ্রংশ। আরবিতে ‘আশরা’ শব্দটির অর্থ ‘দশ’। সমগ্র বিশ্বের মুসলিম স¤প্রদায় এই মাসের ১০ তারিখে ‘আশুরা’ পালন করে থাকেন।

মহরম মাসের ১০ তারিখটিও বিভিন্ন কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি একাধারে পুণ্য অর্জনের ও শোকপালনের দিন। মহরম মাসের ১০ তারিখে আল্লাহ্তায়ালা আসমান-জমিন, বেহেস্ত-দোজখ, চন্দ্র-সূর্য, বাতাস-পানি ইত্যাদি-সহ এই বিশ্বব্রহ্মাÐ সৃষ্টি করেছিলেন। এ দিনেই তিনি হজরত আদমকেও সৃষ্টি করেছিলেন। মহাপ্লাবনের সময় হজরত নুহ্ আ. এর নৌকা এই দিনেই জুদি পাহাড়ের পাদদেশে মাটির স্পর্শ পেয়েছিলো। পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, এই আশুরার দিনেই কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে।

রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আশুরার রোজা। আশুরার দিন রোজা রাখলে ও বিশেষ নামাজ আদায় করলে অধিক পুণ্য অর্জন হয়। হজরত মহম্মদ বলেছেন, আশুরার দিন যে ব্যক্তি তাঁর পরিবারের জন্য মুক্তহস্তে ব্যয় করবেন, আল্লাহপাক তাঁকে সারা বছরের সচ্ছলতা দান করবেন। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে আশুরার দিনটি পালন করেন।
এ দিনটি শোকের দিন। কারণ, হিজরি ৬১ অব্দে ১০ মহরম মুহম্মদ স. এর আদরের দৌহিত্র, ফতিমা বিবির পুত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) পরিবার ও অনুগামী-সহ কারবালা প্রান্তরে এজিদের সঙ্গে এক অসম যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন। এই নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যাকাÐে স্বৈরাচারী এজিদের হাত থেকে হোসেনের ৬ মাসের শিশুপুত্র আলি আসগরও রেহাই পাননি। এর কিছু দিন আগেই এজিদের ষড়যন্ত্রে ফতিমা-আলির জ্যেষ্ঠপুত্র হজরত হাসানকে হত্যা করেছিলেন তাঁরই এক স্ত্রী।

খলিফা মাবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র এজিদ হিজরির ৬০ অব্দে নিজেকে মুসলিম দুনিয়ার খলিফা ঘোষণা করেন। শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী। এই সমস্ত কারণে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন তাঁকে খলিফা হিসেবে মান্যতা দিতে অস্বীকার করেন এবং পরিবার-পরিজন ও অনুগামীদের নিয়ে মদিনা ত্যাগ করে মক্কা চলে যান।

এই সময় ইরাকের অধিবাসীরা এজিদ ও ইরাকের শাসনকর্তা ওবায়দুল্লার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বার বার হোসেনকে ইরাক যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। ইরাকিদের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রেখে হোসেন সকলকে নিয়ে ইরাকের উদ্দেশে রওনা দেন। এ দিকে তখন এজিদের অধীনস্থ ইরাকের শাসনকর্তা হোসেনের অনুগামী মুসলিমদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় ইরাকিরা হোসেনকে খলিফা হিসেবে পেতে চাইলেও প্রাণভয়ে কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখায় না। এই সুযোগে ওবায়দুল্লা চার হাজার সৈন্য কারবালার প্রান্তরে দলবল সমেত হোসেনকে ঘিরে ফেলে ফেরাত নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। পানি ছাড়া মানুষ কত ক্ষণ বাঁচবে? ছোট বাচ্চারা তৃষ্ণায় ছটফট করছে দেখে ইমাম হোসেনের বিশ্বস্ত অনুগামী আব্বাস ফেরাত নদীতে পানি আনতে যান। মশক ভরে পানি নিয়ে তিনি যখন শিবিরের উদ্দেশে দৌড়তে শুরু করেছেন, সেই সময় শত্রæপক্ষের আক্রমণে তাঁর দুই হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি তখন মশকটি মুখে ধরে শিবিরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। শিবিরে যে তাঁর প্রিয় হজরতের সন্তানেরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছে। কিন্তু শিবিরে পৌঁছনোর আগেই বুকে তিরবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
এ দিকে পানির জন্য শিশুরা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে। হোসেনের কোনও অনুরোধ উপরোধ শত্রæপক্ষ শুনতে চায় নি। তিনি তাঁর ছ’মাসের শিশুপুত্র আলি আসগরকে বুকে নিয়ে ফোরাত নদীর দিকে রওনা দিলে পিতার কোলেই তিরের আঘাতে আসগর প্রাণ হারায়।

অবশেষে যুদ্ধ যখন চাপানো হয় তখন বীরপুরুষের মতো মোকাবিলা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। এই স্বল্পসংখ্যক মুসলমান যাদের সংখ্যা ৭০-৭২ হবে তাদের মোকাবিলায় ছিল এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। এদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। অবশেষে হজরত ইমাম হোসেন রা. কারবালায় প্রান্তরে বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।

হজরত ইমাম হোসেন রা. কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের লোভ রাখতেন না, তিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি ন্যায়ের জন্য দন্ডায়মান হয়েছিলেন। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় তার ত্যাগ, কোরবানি আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রেখে গেছে। নিজের অধিকার নিজের জীবন বাজি রেখে পৃথিবীতে সত্যের প্রসার করেছেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আমাদের উচিত হবে এ মাসে অধিকহারে নফল ইবাদতে রত হওয়া। কেননা এ মাসের নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত রমজান মাস ছাড়া অন্য যে কোনো মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম। (মুসলিম ও আবু দাউদ)। আশুরার রোজার বরকতে আলস্নাহতায়ালা বান্দার এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেন। অন্য হাদিসে এ সুখবর প্রদান করেছেন স্বয়ং বিশ্বনবী। তিনি স. বলেছেন, ‘আমি আলস্নাহর কাছে আশা করি যে, আশুরার রোজার ফলে আগের এক বছরের গোনাহর কাফ্ফারা হয়ে যাবে’ (মুসলিম)। মুসলিম শরিফের অন্য এক বর্ণনায় জানা যায়, মহানবীর স. ইন্তেকালের আগের বছর তিনি স. ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে ৯ তারিখেও রোজা রাখব। এজন্যই আশুরার রোজার সঙ্গে সঙ্গে এর আগের দিন রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন উলামায়ে কেরাম।

১০ মহররমকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত করা কোনভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়। হজরত ইমাম হোসেন (রা.) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় যে আদর্শ রেখে গেছেন তা সব সময় আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে।

আরও পড়ুন :ওমিক্রন; জনসচেতনতার বিকল্প নেই

জনপ্রিয়