ইসলামের বিভ্রান্তিতে আলেম সমাজের ভূমিকা

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, মে ২৮, ২০১৯ ১২:৩০:৫৪ অপরাহ্ণ
Kaba
ছবি: সংগৃহীত

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
চলমান বার্তার পাঠকদের জন্য আমাদের আজকের আয়োজন ‘ইসলামের বিভ্রান্তিতে আলেম সমাজের ভূমিকা’।

আলেম সমাজের ভূমিকা:
আলেম শব্দের আভিধানিক অর্থ জ্ঞানী। বর্তমানে যাঁর মধ্যে দ্বীনি এলেম আছে তাঁদেরকেই আমরা আলেম হিসেবে জানি। যেমন: মসজিদের খতিব সাহেব, হাফেজ, মুফতি প্রভৃতিজনকে। সমাজ গঠনে আলেম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার উচিত। সমাজের যে কোনো অসংগতি, ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া দরকার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের আলেম সমাজ নিজেদের এক কাতারে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছেন। এঁরা খুব সহজেই মিলাদ নিয়ে, বিদয়াত নিয়ে, ঈদ এ মিলাদুন্নবী নিয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। একজন বলেন মিলাদ পড়া ভালো, আরেকজন বলেন মিলাত পড়া হারাম। কেউ তরীকা বিশ্বাস করেন, কেউ আবার করেন না। যিনি তরীকায় বিশ্বাস করেন না তিনি নিজের মত করে তরীকার বিরুদ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়ে থাকেন। একেক মসজিদের খতিব একেক ভাবে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। অথচ মসজিদের কাঠামো নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না। মসজিদের নীচতলা মার্কেট উপরে মসজিদ এই ডিজাইনটা কোথা থেকে আসল, মুসুল্লীদের নামাজের মধ্যে জোরে জোরে মোনাজাত করা, উচ্চস্বরে ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য দেয়ার নিয়মটা কতটা প্রনিধানযোগ্য- সে বিষয়ে আমরা জানতে পারি না। ফলে আমরা তথা সাধারণ মুসুল্লীরা পড়ে যাচ্ছি বিভ্রান্তিতে। তাছাড়া একে অন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্বক বক্তব্য দিতেও কুন্ঠাবোধ করেন না। অনেক আলেম নামধারীকে আবার বড় বড় রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতা হিসাবেও দেখা যায়। ইসলামে একাধিক জানাজার নামাজ পড়ার বিধান না থাকলেও এসকল আলেমকে আবার একাধিক জানাজার নামাজে ইমামতি করতে দেখা যায়।

ইসলাম কি বলে:
আলেমদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সর্বাঙ্গে, সর্ব শিখরে। কারণ একজন ইমাম হচ্ছেন মসজিদ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নেতা। তিনি কখনো অন্য কারোর নিকট জবাবদিহিতা করবেন না-এটাই ইসলামের আইন। আর ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে পাশ্ববর্তী মসজিদের ইমামদের সহযোগিতা ও পরামর্শে নিয়োগ দেয়াই উত্তম। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশের মসজিদের ইমাম সাহেবদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন ‘মসজিদ কমিটি’। কমিটির সদস্যরা হাফেজ, মুফতি শ্রেণির ব্যক্তিদের ইমাম নিয়োগের পরীক্ষা নেন। অথচ ঐ মসজিদ কমিটি বা নির্বাচক কমিটির মধ্যে হাফেজ কিংবা মুফতি অনেক ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যায় না। অবস্থাটা এমন, যেন ‘পরীক্ষকের চেয়ে পরীক্ষার্থী বিজ্ঞ’। অনেক ক্ষেত্রে আবার ইমাম সাহেবদের দায়িত্ব পালন করতে হয় কমিটির চাহিদা মাফিক, যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। আমরা আলেমদের কাছ থেকে জানতে চাই ইসলাম সম্পর্কে। এ ধর্মের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সদুত্তর পাওয়া যায় না। জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার নামাজের পর অনেক ইমাম সাহেবকে জোরে জোরে মোনাজাত করতে দেখা যায়। এসময় যে সকল মুসুল্লী পুরো নামাজ জামায়াতে শরিক হতে পারেন নাই, কেউ তিন রাকায়াত, কেউ দুই রাকায়াত কেউ আবার এক রাকায়াত পেয়েছেন, সালাম ফেরানো পর ঐ সকল মুসুল্লীরা ফরজ নামাজের বাকি রাকায়াত আদায় করতে থাকেন। এ অবস্থায় জোরে জোরে মোনাজাত করা কতটা যৌক্তিক-প্রশ্ন করেও উত্তর মেলে না। আমরা জানি, মোনাজাত নামাজের কোন অংশ না। এটি নফল। আর এই নফল দিয়ে ফরজের ব্যাঘাত সৃষ্টি করা কোন অবস্থায়ই ইসলাম সমর্থন করে না। মনে রাখতে হবে, শতাধিক কিংবা তারও অধিক মুসুল্লীর নফল ইবাদতের চেয়েও একজন মুসুল্লীর ফরজ এবাদত শ্রেষ্ঠ। এবং কোন অবস্থায়ই ঐ মুসুল্লীর নামাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এমন কার্য থেকে অবশ্যই নিজেদের বিরত থাকতে হবে।

ঢাকা শহরে অনেক মসজিদ এমন কি আমাদের জাতীয় মসজিদে দেখা যায়, নীচ তলায় মার্কেট উপরে মসজিদ। পৃথিবীর আর কোথাও এমনটা দেখা যায় না। দুনিয়াতে মসজিদ যখন আল্লাহর তরফ থেকে নির্মাণের আদেশ দেয়া হলো তখন আমাদের দেশের মত এমন কাঠামো দেয়ার কোন দলিল কোথাও আছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ নিয়ে ইমাম সাহেবদের কাউকে কোন বক্তব্য দিতে দেখা যায় না। অনেক মসজিদে আবার মেস বানিয়ে ভাড়া দেয়া হয় যা নবীজির নির্ধারিত মসজিদ কাঠামোর পরিপন্থী। দেশের সকল সমজিদের ইমামদের মাঝে একটা সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠা আবশ্যক। তারাবিহ’র নামাজে কোরআন খতমের যে পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, প্রতিটি মসজিদে একই খুৎবা পাঠ করার বিধান চালু করলে অনৈক্য অনেকাংশেই দূর হবে। নিজেদের মধ্যে ঐক্য থাকলে দেশ তথা জাতিই বেশি উপকৃত হবে। পীর আওলিয়া সম্পর্কে যেখানে কোরআনে সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে, সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। নবীজি সর্বদাই শান্তচিত্তে সুললিত কন্ঠে উপস্থিতিতের মাঝে বক্তব্য দিতেন। নবীর কন্ঠের ওপর কন্ঠ দিয়ে কথা না বলার আদেশ দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে উচ্চস্বরে বয়ান করা নবীজির নিয়মের যে পরিপন্থী তা নি:সন্দেহে বলা যায়।

একজন সাধারণ মুসুল্লী হিসেবে যদি আমার কোন দল বা ব্যক্তির প্রতি নৈতিক সমর্থন থাকে এবং সমর্থিত দল বা ব্যক্তি যদি কোনো অন্যায় কাজ করে তাহলে ঐ অন্যায়ের কুফল নৈতিকভাবে সমর্থনকারীকেও পেতে হবে, এতে কোন সন্দেহ নাই। এক্ষেত্রে আলেম হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের দেশের বর্তমান ধারার রাজনীতিকে সম্পৃক্ত হওয়াটা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা ভেবে দেখা দরকার। একই ব্যক্তির একাধিক জানাজার নামাজ পড়ানোর আগে খুব ভালো করে জানা দরকার যে নবীজি কখনো কারো একাধিক জানাজার নামাজ পড়িয়েছেন কি-না? তাছাড়া সাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈ কাঁরো সময় এমন করা হয়েছে এ সংক্রান্ত কোন দলিল আছে কি-না। ইসলামে যদি কোন ব্যক্তি একাধিক জানাজার নামাজের কোন নির্দেশনা না থাকে তবে তা অবশ্যই পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

(আগামী পর্বে দেখুন: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, ইসলাম কী বলে? চোখ রাখুন চলমান বার্তায়)

আরও পড়ুন :আমাদের দেশে কর্মজীবনে ইসলামের প্রভাব কতটুকু?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ

জনপ্রিয়