কবিতার গল্প

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১১, ২০১৯ ১১:০০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

কবিতার গল্প
মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

৯০ সাল। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। দেশব্যাপী টানা তিনদিনের হরতাল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কল কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাস ট্রাক সবকিছু বন্ধ। মনে হচ্ছে একটা মানুষের জন্য, একজন শাসকের দুঃশাসনের হাত মুক্ত হতে গোটা দেশ যেন স্থবির হয়ে আছে, প্রকৃতিও নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে অবিরত। ৭২ ঘন্টার লাগাতার হরতাল শেষে আজই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলেছে, বন্ধ পরীক্ষার তারিখ দিয়েছে। রাস্তায় চলতে শুরু করেছে যানবাহনগুলো। ঘরবন্দি মানুষগুলো কাজের তাগিদে ছুঁটছে বিরামহীনভাবে। তবুও মানুষের মনে কেমন যেন একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। না জানি আবারও হরতাল দিয়ে বসে আন্দোলনকারীরা। সজল ছোট বোন ঝুমাকে নিয়ে উল্লাপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে সেই সকাল থেকে। গ্রামের বাড়ি বলরামপুর থেকে আট মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসে এমনিতেই ক্লান্ত ছিল ওরা। উদ্দেশ্য নগরবাড়ি। সেখান থেকে লঞ্চ কিংবা ফেরীতে আরিচা হয়ে ঢাকা। মা-বাবা দুজনেই মানা করেছিল আজকে রওয়ানা না দিতে। কিন্তু আগামী পরশু আবার সজলের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। যদি কোন সমস্যা হয় সেই ভয়েই মা-বাবার নিষেধ সত্যেও আজই যাত্রা করেছে। ঢাকা যাওয়ার বায়না ধরেছিল ছোট বোনটা। ওর পরীক্ষা শেষ তাই ঢাকা বড় ভাইয়ের বাসায় যাবে বেড়াতে। অনেকগুলো বাস চলে গেছে কিন্তু উঠতে পারেনি ওরা। প্রতিটা বাসের ভিতরে এমন কি ছাদে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। মনে হচ্ছে প্রত্যেকেই ঢাকার জনশূন্যস্থানকে পূর্ণ করতেই ছুটে যাচ্ছে। এর মাঝেও কিছু লোক নামছে আবার উঠছে। সজল হয়তো উঠতে পারতো, কিন্তু বোনটাকে নিয়ে তো আর উঠা সম্ভব না। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত নগরবাড়ির বাসেই উঠতে পারনি। ছোট্ট বোনটার জন্য মনে মনে বিরক্ত হচ্ছে সজল, কিন্তু নিস্পাপ মায়াবী চেহারার দিকে তাঁকিয়ে তা প্রকাশ করতে পারছে না। এমনিতেই ও বেশ মেধাবী ও চঞ্চল। যে কারণে অন্যান্য ভাই-বোনদের চেয়ে একটু বেশীই আদর করে ওকে সজল।
-ভাইয়া আজকে যদি যাওয়া না হয় তাহলে কি হবে?
-কি আর হবে বাড়ি ফিরে যাবো। কালকে আবার আসবো। তোর কি ক্ষিদে পেয়েছে?
-হ্যাঁ, একটু পেয়েছে। তবে এ ক্ষিদায় না খেলেও কোন সমস্যা নেই। বাসে উঠতে পারলে লঞ্চে মার দেয়া পরাটা-ডিম আর ঝালমুড়ি খাব। আর ঢাকা যাওয়া না হলে বাড়ি গিয়েই খাব। ভাইয়া আমি কি তোমাকে খুব বেশী কষ্টে ফেলে দিলাম?
-কেন রে।
-আমি না থাকলে তো তুমি ঠিকই উঠে যেতে পারতে।
-তা হয়তো পারতাম, তাতে কি তোর আশা পূরণ হতো? হতো না। আল্লাহকে ডাক, উনি নিশ্চয়ই আমাদের যাবার ব্যবস্থা করে দিবেন।
-এ পর্যন্ত সাড়ে সাত হাজার বার ডেকেছি। আর আড়াই হাজার বার ডাকবো এর মধ্যে বাসে উঠতে না পারলে বাড়িই চলে যাবো।
-মানে?
-তুমি বাসের দিকে তাকিয়ে থাকো আর আমি ব্যাগের পাশে বসে আঙ্গুলের কড় গুণে গুণে এপর্যন্ত সাড়ে সাত হাজার বার আল্লাহকে ডেকেছি যাতে একটা খালি বাস আসে আর আমরা উঠতে পারি।
-ঝুমার কথা আর কা- দেখে সজলের শুকনো মুখে এক চিলতে হাসি ফুঁটে উঠে। কাছে টেনে নিয়ে-তুই এতো ভালো কেন রে ঝুমা।
ঝুমার মুখে এবার বিদ্রপের হাসি। আমাকে তুমি ভালো সব সময়ই বলো সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আজকের দিনে আমাকে ভালো বলাটা মনে হয় তোমার ঠিক হলো না। আমি যদি ভালোই হতাম তাহলে আব্বু-আম্মু আমাকে এতবার নিষেধ করলো, আমি কি শুনেছি? শুনিনি। আর না শুনে তোমাকে ফেলে দিলাম মহা ঝামেলার মধ্যে।
-ক্লাশ ফোর এ পড়িস, এত প-িতের মত কথা শিখলি কোত্থেকে?
-ভাইয়া একটা বাস, মনে হচ্ছে নগরবাড়ি যাবে।
ব্যাগ নিয়ে এক প্রকার দৌঁড় দিয়েই বাসের কাছে আসে সজল। সিট খালি না থাকলেও দাঁড়ানোর জায়গা আছে।
-ভাই একটা মহিলা সিট হবে-কথাটা বলা শেষ না হতেই পিছন থেকে ঝুমার ধাক্কা।
-আগে ওঠো, সিট না পেলে দাঁড়িয়েই যাবো।
বাসে উঠে ভাই-বোন।
-তোর ব্যাগ কোথায় রেখেছিস?
-রেখেছি কোথায় জানি না, চল নগরবাড়ি গিয়ে খুঁজে নিব।
-এভাবে দাঁড়িয়ে যাবি।
-হ্যাঁ যাবো।
-তোর কষ্ট হবে না।
-সকাল থেকে বাসষ্টান্ডে বসেই ছিলাম এবার না হয় এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকবো। তুমি উপরের হ্যান্ডেল ধরো আর আমি সিট ধরে দাঁড়িয়ে থাকি।
দাঁড়িয়ে থাকা ভাই-বোনের কথা শুনছিল বাসের অন্যান্য যাত্রীরা। ঝুমা যে সিটটা ধরে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই বসেছিল মাঝ বয়সী একজন ভদ্রলোক পাশের সিটে একটা মেয়ে। দেখে মনে হচ্ছে কলেছে পড়ে। প্রায় সারাদিনের ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে যে ঝুমার কষ্ট হচ্ছিল সেটা সজল বেশ বুঝতে পারছে। বাস চলতে শুরু করেছে। কিছুদুর যেতে না যেতেই সজল লক্ষ্য করে বাসের সিট ধরে ঝুমা ঝিমাচ্ছে। সামনে সিটে বসা ভদ্রলোকটা কি মনে করে সিট থেকে উঠে ঝুমাকে বসতে বলে। ঝুমাও কালবিলম্ব আর কোন দ্বিধা না করে শুধু ‘থ্যাক ইউ আঙ্কেল’ বলেই বসে পড়ে। আর বসেই পাশে বসা মেয়েটার ঘাড়ে মাথা রেখে একদম ঘুম। কোথায় যাবেন- ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করে সজলকে।
-জ্বি, ঢাকা যাবো।
-আমরাও।
-কখন থেকে অপেক্ষায় ছিলেন এখানে।
-সেই সকাল থেকে।
-আমরাও ঢাকা যাবো।
-কোথা থেকে আসছেন আপনারা?
-নওগাঁ থেকে।
-নওগাঁ থেকে! বিস্বয়ে প্রশ্ন করে সজল। কেন নওগাঁ থেকে সরাসরি ঢাকার বাস ছিল না?
-হ্যাঁ ছিল, তবে তাতে কোন সিট খালি ছিল না। তাই অগত্যা নগরবাড়ির বাসে উঠেছি। আরিচা পর্যন্ত যেতে পারলে ওখান থেকে বাস পাওয়া যাবে এ আশায়ই এই লোকাল বাসে।
-ঢাকায় নিশ্চয়ই জরুরী কোন কাজ আছে।
-হ্যাঁ বাবা, জরুরী কাজই বলতে পারো, কালকে কবিতা মানে আমার মেয়ের ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা।
মাঝ বয়সী আর তরুন-দুই প্রজন্মের দুইজন বাসযাত্রীর দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে চলছে গল্প আর ওদিকে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার্থী আর ক্লাশ ফোরের ছাত্রী গভীর ঘুমে অচেতন। কন্ট্রাকটরের কর্কশ আওয়াজ জানান দেয় বাস নগরবাড়ি চলে এসেছে। এবার নামতে হবে।
ধরপরিয়ে উঠে ঝুমা। নিজের ব্যাগটা নিয়ে পাশে বসা মেয়েটার হাত টেনে নিয়ে নামতে যায় বাস থেকে-আপু চলো।
মেয়েটি বলে, আমার ব্যাগ…
-ভাইয়া আপুর ব্যাগটা নিয়ে তুমি নামো, আমরা এগোচ্ছি।
ঝুমার স্বল্প পরিচয়ের আপুর আর নিজের ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়ে সজল সাথে মেয়েটির বাবা।
ঘাটে ফেরি ও লঞ্চ দুটোই ছিল। কিন্তু ঝুমা ফেরিতে যাবে না, ওর পছন্দ লঞ্চ। কারণ এটি তাড়াতাড়ি যায়। অগত্যা তিনজন ওর কথায় সায় দিয়ে লঞ্চে গিয়ে ওঠে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। লঞ্চ চলতে শুরু করেছে। ভাগ্য ভালো বলতে হবে এজন্য যে, কেবিনে চারটা সিট জোগাড় হয়েছে। সবাই যখন কেবিনে বসে আরাম করছিল, সজল তখন বাইরে আনমনা হয়ে লঞ্চের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। পরীক্ষার চিন্তার ছাপ চোখে মুখে ফুঁটে উঠেছিল পরিস্কারভাবেই।
-ভাইয়া মা যে পরাটা আর ডিম দিয়েছিল খাবে না?
ঝুমার ডাকে সম্ভিত ফিরে দেখে ঝুমা মেয়েটিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-না-রে আমার ক্ষিদে নেই, তুই খেয়ে নে।
-দিয়েছে তো দু’জনেরটা, আমি একা কি করে খাবো।
-খেতে না চাইলে রেখে দে, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।
-তুমি না খাইলেও কোন অসুবিধা নাই। আপু নাও তুমি আর আমি খাই। আরে খাও না, দেখ আমার মা তার সন্তানদের জন্য কি যতœ করে বানিয়ে দিয়েছে। যদিও ঠান্ডা হয়েছে, তবু খেয়ে দেখ কি মজা।
-হ্যাঁ, মায়ের হাতের জিনিসতো অনেক মজা-কথাটা বলতেই যেন বিষন্নতা ভর করে মেয়েটির মুখে। আর কোন কথা না বলেই খেতে শুরু করে।
-ভাইয়া আমি কেবিনে আঙ্কেলের সাথে গল্প করছি, একটু পরে মুড়িওয়ালাকে দেখলে পাঠিয়ে দিও।
-আপনি গেলেন না যে।
-অনেকক্ষণতো বাসেই বসেছিলাম, এখন আর বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
-পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন হলো।
-মানে।
-কালকে আপনার ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি না?
-ও হ্যাঁ। হয়েছে আর কি।
-আপনি কবিতা।
-বাবা বলেছে নিশ্চয়ই।
-আমি….
-সজল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ছেন।
-নিশ্চয়ই ঝুমা বলেছে।
-আপনার বোনটা খুব ভালো একটা মেয়ে। আপনি ওকে অনেক আদর করেন তাই না।
-হ্যাঁ, কেন জানি না পরিবারের আর সবার চেয়ে ও আলাদা। সারাক্ষণ হাসিখুশিমাখা দুষ্টমি আমাকে দারুনভাবে মুগ্ধ করে।
কথার ফাঁকে সজল আবারও সিগারেট ধরায়।
-এই জিনিসটা কি আপনার খুব প্রিয়?
-বলতে পারবো না, তবে অভ্যাস হয়ে গেছে।
-কেউ কিছু বলে না।
-না, এখন আর কেউ কিছু বলে। প্রথম প্রথম বাবা-মা বিশেষ করে ঝুমা অনেক কিছুই বলতো। ওতো একবার আমার পুরো প্যাকেটই পানিতে ফেলে দিয়েছিল।
-পরিবারের বাইরের বিশেষ কেউ কি এটা জানে?
-মানে….বলেই সরাসরি কবিতার চোখের দিকে তাকায় সজল। সুন্দর হাসি মাখা মুখ কিন্ত লজ্জাবনত। মনে হচ্ছে লতার লগার ফুল, ঝড়ে দোলা সইতে পারবে না।
-না না, আমি তেমন কিছু মিন্ করে বলেনি। মাথাটা নিচু করে আস্তে করে বলে, শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে….
কবিতার কথা শেষ করতে না দিয়ে হাসতে হাসতে বলে সজল, বান্ধবী থাকে, প্রেমিকা থাকে এইতো।
উত্তর শুনে যেন লজ্জা পায় কবিতা। লাজুক স্বরে বলে, শুনেছি আর কি।
-থাকে, তবে সে সৌভাগ্য আমার হয়নি।
-কেন? বেশ অবাক হয়েই প্রশ্ন করে কবিতা।
-দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মেয়েদের অধিকাংশই বিত্তশালী ঘরের। তাদের জীবন যাপন আমার খুব একটা পছন্দ না। এদের মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এত বেশী যে, একমাত্র পহেলা বৈশাখ ছাড়া বোঝার উপায় নেই এরা বাঙ্গালী। আর আমি স্কুল শিক্ষক পিতার আদর্শে নিজেকে বাঙ্গালী ভাবি বলেই অনেকে আমাকে পছন্দ করলেও বন্ধুর বাইরের কোন সম্পর্কে জড়াতে সাহস পায় না কেউ। আবার হাসি সজলের মুখে। তাছাড়া আমি জানি কি রকম কষ্টে বাবা, ভাই আমার পড়ার অর্থের জোগান দিচ্ছেন। এর প্রতিদান দিতে চাইলে ও দিকে আমার মনোযোগ না দেয়াই ভালো- আপনি কি বলেন?
-সেটা ঠিক, তবে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত বাঙ্গালী আদর্শের কাউকে পেলে তখন কি করবেন?
কথাটা শুনে আচমকা অচেনা এক ঢেউ যেন দোলা দিয়ে যায় সজলের মনে। উত্তরটা কি হবে ঠিক বুঝতে পারে না। কারণ এমন প্রশ্ন জীবনে কেউ কখনো করেনি সজলকে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কবিতার দিকে। সোনালী রোদের আলোয় কবিতাকে দেখতে যেন আরো বেশী সুন্দর লাগে সজলের কাছে। লম্বা চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে যে মুখের উপর পড়ে আছে সেদিকেও খেয়াল নেই যেন এতটুকু। পায়ের আঙ্গুল দিয়ে লঞ্চের শক্ত পাটাতন আঁচড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
-কি, কিছু বলছেন না যে- মাথা নিচু করে আবারও প্রশ্ন কবিতার।
নিজেকে সামলে নিয়ে সজল কৃত্তিম হাসিমাখা মুখে জবাব দেয়, আগে পাই তো তখন দেখা যাবে।
সজলের মুখে হাসি ফুঁটলেও কবিতা বেশ নীরব। মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারছে না সজলের মত নি:সংকোচে। মেয়েদেরা হয়ত এমনই। অব্যক্ত অনেক কিছুই হয়তো মনের গভীরের জায়গা দখল করে থাকলেও প্রকাশ করার মত স্বাধীনচেতা হতে পারে না। কবিতা চোখ তুলে তাকায় যমুনার ঘোলা জলের দিকে। দৃষ্টিতে আটকে যায় চরের বুকে হাসি ফোঁটানো কাশফুল। কি সুন্দর, না?
-কি?
-ঐ যে চরের বুকে দোল খাচ্ছে প্রকৃতির সৌন্দর্য কাশফুলগুলো।
-না, সুন্দর না।
-মানে-অবাক হয়ে প্রশ্ন করে কবিতা।
-পৃথিবীতে সুন্দর বলে কিছু আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। আছে সুন্দর উপস্থাপনা। এই যে আপনি, যে কাশফুলগুলোকে সুন্দর বলছেন আমার কাছে তা সুন্দর মনে হচ্ছে না। সুন্দর রোদে ঘোলা পানির মাঝে জেগে উঠা চরের মাঝে ফোঁটা কাশফুলগুলো যদি কোন গোলাপ বাগানের মাঝে ফুঁটতো তাহলে কিন্তু আপনার কাছে সুন্দর মনে হতো না। বিশ্রী লাগতো। আসলে এই পরিবেশটাই ওকে এতোটা সুন্দর করে তুলেছে।
-ঠিক বুঝলাম না।
-এই যে ধরুন আপনি, হালকা রংয়ের শালোয়ার কামিজ পড়ে আছেন, সাথে মানানসই টিপ আর খোলা চুলে আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। অর্থাৎ আপনার রুচি ও নিজেকে উপস্থাপনার বুদ্ধিমত্তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এখন আপনি যদি এগুলোর পরিবর্তে মোটা পাড়ের শাড়ী আর মাথা ভর্তি নিদ্রাকুসুম তেল মেখে মাঝখানে লম্বা সিথিঁ করতেন তখন কিন্তু আপনাকে খালাম্মা খালাম্মা লাগতো।
-এবার আর কবিতা হাসি দমাতে পারে না। মুচকি হেসে বলে, সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ছেন তো তাই আপনার মত করে আমি চিন্তা করতে পারি না।
-কেন, আমি কি মিথ্যা বললাম? দেখুন গোটা পৃথিবীটাকে তখনই সুন্দর মনে হবে, যখন আপনি তার সমগ্র রূপটাকে উপভোগ করতে পারবেন, পাহাড়টাকে নির্লজ্জ ল্যাংটা মনে হবে-যদি না সবুজে ওটা আবৃত না থাকে, সমুদ্র কখনো আপনাকে আনন্দ দিবে না-যদি না পাশে মনের মানুষ না থাকে, পুর্নিমার চাঁদ তখনই ভালো লাগবে-যখন আপনার মন ভালো থাকবে, সংসার জীবনের সবকিছুই আপনি উপভোগ করতে পারবেন যদি আপনার স্বামী নামক ভদ্রলোকটা আপনাকে মূল্যায়ন করবে, বুঝবে। এর ব্যতিক্রম হলেই দেখবেন পৃথিবীর কোন কিছু সুন্দর না, অসুন্দরে ভরে আছে গোটা দুনিয়া।
সজলের মুখের দিকে নিস্ফলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কবিতা। এমন অল্প সময়ের পরিচয়ে কি ঘনিষ্টভাবেই না কথা বলছে ওরা। সুন্দরের এমন ব্যাখ্যা আগে কখনো কোথাও শোনেনি। তবে এখন কেন জানি পৃথিবীর সবকিছুই অসম্ভব সুন্দর লাগছে নিজের কাছে। কিন্তু কেন? উত্তর মেলাতে পারছে না। তাহলে কি……..। না, কি সব ভাবছি।
-কি আবারও চুপ হয়ে গেলেন যে।
-কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। প্রকৃতিকে উপভোগ করতে ইচ্ছে করছে। কেন জানি (চারিদিকে তাকিয়ে বলে) পৃথিবীর সবকিছুই আমার কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে।
মনের বড়চেয়ে গহীনে কেমন যেন দোলা দিয়ে যায় সজলের। তাহলে কি কবিতা……। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে স্বভাবসূলভ হাসিমুখে বলে, কারো কথা কি মনে পড়ছে।
-না, মনে পড়ছে না। আর থাকলে তো মনে পড়বে।
দৃষ্টি ফেরায় কবিতা সজলের দিকে, চোখে চোখ রেখে কি যেন বলতে চায় দু’জন কিন্তু বলতে পারছে না। এক অদ্ভুত অনুভূতি স্পর্শ করে আছে উভয়কেই। বুঝতে পারছে কিন্তু বলতে পারছে না। অব্যক্ত ভাষায় যেন একে অপরকে বলছে সেই চিরায়ত বাক্য আমি…………..।
-ভাইয়া মুড়িওয়ালা কই। তোমাকে না বললাম মুড়িওয়ালাকে পেলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে। ঝুমার হঠাৎ আবির্ভাব সুন্দর লাগা ভাবনাগুলোয় ছেদ টেনে দেয়। কিন্তু রেশ কাটে না।
-এদিকে আসেনি রে ঝুমা। আসলে নিশ্চয়ই পাঠিয়ে দিব।
-ঠিক আছে, বলেই চলে যায় কেবিনে।
-ঢাকায় কোথায় উঠবেন-সজলের প্রশ্ন।
-আমার এক চাচাতো বোনের বাসায়।
-কয়দিন থাকবেন।
-কালকে পরীক্ষা। হয়তো তারপর বড়জোড় একদিন থাকতে পারি।
-ঐ একদিন কি করবেন।
– কেন?
-না, এমনিই।
-এমনিই-
-আমার আবার ঐ দিন পরীক্ষা। তবে দুইটার পর আমি আবার একদম ফ্রি।
-আমি ঢাকা শহরের রাস্তা-ঘাট খুব একটা চিনি না। তাছাড়া…..
-তাছাড়া কি?
-না থাক। বলেই চুপ হয়ে যায় কবিতা। মনে মনে ভাবে, কি হলো আমার। এমন লাগছে কেন? কেন বলতে ইচ্ছে করছে ঐ ফ্রি বিকালে তোমার পরীক্ষার পর আমি অপেক্ষা করবো। তারপর দু’জনে একাত্ব হয়ে আজকের না বলা কথাগুলো পার্কে বসে বাদাম চিবুতে চিবুতে বলবো। আবারও দেখা হোক সজলের সাথে এ তীব্র আকাংখা মন থেকে দুর করতে পারছে কবিতা। কিন্তু কেন? তাহলে কি সজলকে আমি……..।
কবিতা কি যেন ভাবছে। ভাবনার মুলে কি আমি? কি করে বলি আমার পরীক্ষার পর তুমি টিএসসি কিংবা পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে এসো। আমি অপেক্ষা করবো। তারপর যা বলা হলো না আজকে তা বলবো সেদিনের পড়ন্ত বিকেলে। তুমি বাঙ্গালী সাঁজে আসবে। কানে পড়বে ছোট্ট দুল আর খোঁপায় আমার প্রিয় লাল গোলাপ। সত্যিকারের বাঙ্গালী ললনা হয়ে থাকবে আজীবন ছায়ার মত। আমি তোমাকে কষ্ট দিব না, ¯্রষ্টার সৃষ্টিকে তুমি তোমার মত করে উপভোগ করবে, আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
কবিতার বাবা আর ঝুমা এসে জানাল, লঞ্চ আরিচা ঘাটে ভিড়তে যাচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নামতে হবে। লঞ্চ থেকে নেমে সবাই ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসে উঠে বসে। কবিতা বাবার সাথে সামনের সিটে সজল আর ঝুমা পিছনে। ঢাকার আসার পথে আর কোন কথা হলো না দু’জনার। আড়াই ঘন্টার যাত্রায় নির্বাক হয়ে আছে ওরা। মাঝে দু’একবার কবিতা ঝুমাকে কিছু একটা বলার ছলে সজলের দিকে তাকিয়েছিল। আর সজল কবিতার লম্বা কালো কেশের দিকে তাকিয়ে ভাবনার অতলে নিজেকে নিমজ্জিত রেখেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে গাবতলীতে এসে নামে সবাই।
-মা কবিতা তুই একটু দাঁড়া আমি একটি ঝিগাতলার স্কুটার নিয়ে আসি।
-কবিতা বলে, এখন তো যেতে হবে।
-আনমনা হয়ে সজল জানায়, হ্যাঁ, তবে আবার দেখা হবে।
-কিভাবে দেখা হবে। আমি আপনার ঠিকানা জানি না।
এত কথা, এত ভাব অথচ একে অপরকে ঠিকানাটা লিখে দিতে ভুলে গেছে।
ও তাই তো। আপনি একটু দাঁড়ান আমি এক্ষুণি লিখে আনছি-বলেই দৌঁড়ে এক পান বিক্রেতার কাছ থেকে সিগারেটের ভিতরের কাগজে নিজের ঠিকানাটা লিখে আনে সজল। এদিকে কবিতার বাবা কবিতাকে ভাড়া স্কুটারে বসিয়ে অপেক্ষা করছিল ঝুমার কাছে।
-আমরা আসি বাবা, ভালো থেকো।
স্কুটারের পিছনের ফাঁক দিয়ে কবিতার সুন্দর মুখখানি যেন হতাশা, না পাওয়ার বেদনায় অসম্ভব মলিন দেখাচ্ছিল। হাত বাড়াচ্ছিল ঠিকানার আশায়। সজলও পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল স্কুটারের দিকে। কিন্তু তার আগেই কালো ধোঁয়ার কুন্ডুলী পাকিয়ে স্কুটারটি হারিয়ে যায় গাবতলীর হাজারো গাড়ির ভিতর। মুর্তিমান পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে সজল। পুর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আকাশে, তারপরও পৃথিবীটাকে কি বিভৎস্য, বিশ্রী, কুৎসিত আর যন্ত্রণার আশ্রয়স্থল মনে হতে থাকে সজলের কাছে।

আরও পড়ুন: জীবনের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়