করোনায় নাজেহাল যুক্তরাষ্ট্র, বাইডেন প্রশাসনের জন্য অগ্নিপরীক্ষা

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, জানুয়ারি ৭, ২০২২ ৫:১০:৪০ অপরাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক
এক সপ্তাহে চারবার রেকর্ড ভঙ্গ করে করোনা ভাইরাসের বেদম দৌড়ের মধ্যে দিয়ে নতুন বছরে পদার্পণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অমিক্রন আতংক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আশংকা আপামর সাধারণ মানুষের মনে।

আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের শহরগুলোর চারদিক এখনও আলো ঝলমল। টাইমস স্কয়ারে প্রতিবছরের মত জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব, ঐতিহাসিক বল ড্রপ, মাস জুড়ে বিভিন্ন এলাকায় শত শত বাড়ির আলোক সজ্জা। নতুন বছর উদযাপনের আয়োজনের কোথাও ঘাটতি ছিল না, কিন্তু স্বস্তিতে নেই মানুষ।

করোনাভাইরাস শেষ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন জো বাইডেন। কিন্তু তিনি এখন জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। এ’বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সংসদ বা কংগ্রেসের নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তার সাথে থাকবে ৩৬টি রাজ্যের গভর্নর পদে নির্বাচন। অমিক্রন এই ‘মিড-টার্ম’ নির্বাচনে বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে বড় এক লিটমাস টেস্ট।

টেস্ট কিটের সংকট
অমিক্রন কোভিড-১৯এর আগের ভেরিয়েন্টগুলোর চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম ভয়াবহ হলেও, তা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১০ লক্ষ করোনাভাইরাস কেস শনাক্ত করা হয়। কিন্তু টেস্ট কিটের সংকট, বাড়িতে টেস্ট করা এবং ছুটির কারণে দেরিতে রিপোর্ট করার কারণে এই সংখ্যাকেও পূর্ণ চিত্র মনে করা হচ্ছে না।

তাছাড়া বহু মানুষের উপসর্গ বিহীন সংক্রমণ থাকতে পারে যা তাঁরা নিজেরাই জানেন না। মহামারিতে প্রথমবারের মতো প্রতিদিন গড়ে (বিগত সাত দিনের গড়) চার লক্ষরও বেশি নতুন কেসের রেকর্ড করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। (সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস)

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের নতুন অনুমান বলছে যে ৯ই জানুয়ারি নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সপ্তাহে কেসের সংখ্যা হতে পারে প্রায় ২৫ লক্ষ, যদিও এই সংখ্যা ৫৪ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে।

অমিক্রন ঝুঁকিতে শিশু
এবার এই নতুন ভেরিয়েন্ট, অমিক্রন শিশুদের আক্রান্ত করছে অনেক বেশি। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেটে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে রুগী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। এই মুহূর্তে অমিক্রন সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছে নিউ ইয়র্কে।

নিউ ইয়র্ক স্টেটের স্বাস্থ্য বিভাগ এক বার্তায় জানিয়েছে – ডিসেম্বরের ৫ থেকে ২৪ তারিখের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়েছে চারগুণ। নিউ ইয়র্ক স্টেটের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কমিশনার ডঃ মেরি টি বাসেট বলেছেন ”শিশুদের কোভিড-১৯এর ঝুঁকি বাস্তব।” তিনি অভিভাবকদের পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চাদের টিকা দিতে উৎসাহী করেছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে টিকা নেবার পরও কোভিড আক্রান্ত হয়ে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের এক বার্তায় দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভর্তি হওয়া ৫-১১ বছর বয়সী শিশুদের কারও সম্পূর্ণ টিকা দেয়া ছিল না। একই সময়ে ভর্তি হওয়া ১২-১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের সম্পূর্ণরূপে টিকা দেয়া হয়েছিল। পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় টিকা দেবার পরও শিশুদের আক্রান্ত হবার সংখ্যা কোনও অংশে কম না।

অমিক্রনের এই ভয়াবহতার মধ্যে, যেখানে হাসপাতালে স্থান সঙ্কুলান করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে – অনেকের মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে শিশুদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে।

কুইন্স-এর সামিরা
নিউ ইয়র্কের কুইন্স এলাকার একটি পাবলিক স্কুলে পড়ে সামিরার দুই বাচ্চা। ছুটির শেষে তারা স্কুলে যেতে শুরু করেছে। দুই বাচ্চার টিকা দেয়া হলেও তাঁর সব ছোট বাচ্চার বয়স তিন বছর। সামিরা বলছেন, স্কুল বন্ধ করলে কাজ করবেন কী করে?

”সরকার তো আর কোনো মহামারি সহায়তা দেবে না,” তিনি বলেন।

”কিন্তু যেভাবে করোনা আবারও ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের কেউ করোনা আক্রান্ত হলে আমার ছোট বাচ্চাটারও হবে, আর তার জন্য তো এটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ ওর টিকা দেয়া নেই। কিন্তু আমরা তো অসহায়, কী করবো? ঘরে বসে থাকলে চলতে পারব না।”

অনেকের মতে সরকার বাচ্চাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার চেয়ে অর্থনীতির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যেভাবে অমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে তা যদি এখনই ঠেকানো না যায়- তা হয়তো অর্থনীতির জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ পাবলিক হেলথের ইমার্জেন্সি মেডিসিনের অধ্যাপক ডাঃ মেগান রানি শুক্রবার রাতে সিএনএনকে বলেন, “অমিক্রন সত্যিই সর্বত্র রয়েছে।”

“আগামী মাসে বা তার বেশি সময় ধরে আমি যা নিয়ে খুব চিন্তিত তা হ’ল, আমাদের অর্থনীতি বন্ধ হতে চলেছে, ফেডারেল সরকার বা রাজ্য সরকারের নীতিগুলির কারণে নয়, বরং আমাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হবার কারণে,” তিনি বলেন।

প্রতি ঘণ্টায় আয় করে খরচ নির্বাহ করা সাধারণ মানুষ যারা কোভিড আক্রান্ত হয়ে ঘরে পড়ে থাকছেন, তাদের বেশির ভাগেরই কোনও বিকল্প পথ নেই সংসারের ব্যয় নির্বাহ করার। অনেকেই তাদের প্রয়োজনীয় গ্রোসারির তালিকা ছোট করছেন।

সেন্টার ফর বাজেট এন্ড পলিসি প্রায়রিটিসের গত নভেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণা তথ্যমতে, মানুষের দুর্ভোগ ২০২০ এর চরম অবস্থা থেকে কমে গেলেও এখন অনেক বিস্তৃত।

গত বছর ২৯শে সেপ্টেম্বর থেকে ১১ই অক্টোবর পর্যন্ত সংগৃহীত হাউসহোল্ড পালস সার্ভে ডেটা অনুসারে, ” প্রায় ২০ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক যা দেশের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯ শতাংশ – রিপোর্ট করেছেন যে, তাদের পরিবারে মাঝে মাঝে বা প্রায়শই গত সাত দিনে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। কেন জিজ্ঞাসা করা হলে, ৮২ শতাংশ মানুষ আরও খাবার কেনার সামর্থ্যের অভাবের কথা বলেছেন ।

এছাড়াও, পালস সার্ভে থেকে আরও বিশদ তথ্যের বিশ্লেষণ দেখায় যে ৫০ থেকে ৯০ লক্ষ শিশু এমন একটি পরিবারে বাস করে যেখানে শিশুরা পর্যাপ্ত পরিমাণে খায় না কারণ পরিবার এটি বহন করতে পারে না।

পর্যাপ্ত খাবার না পাবার সংকট কৃষ্ণাঙ্গ এবং ল্যাটিনো প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবারেই বেশি- শ্বেতাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় যা প্রায় দিগুণেরও বেশি । যেখানে ৬ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবার এই সীমিত খাদ্য সংকটে ভুগছে, সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবার ১৭ শতাংশ, ল্যাটিনো প্রাপ্তবয়স্করা ১৬ শতাংশ।

প্রাপ্তবয়স্ক যারা আমেরিকান ভারতীয় বা বহুজাতিক হিসাবে পরিচয় দেয় তাদের পরিবার তিনগুণ বেশি এই সীমিত খাদ্য সংকটে ভুগছে।

যে ড্রাইভার উবার, লিফট বা ট্যাক্সি চালিয়ে ব্যয় নির্বাহ করেন, সে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে , বা তার পরিবারে কেউ আক্রান্ত হলে- সঞ্চিত অর্থ না থাকলে তারা এখন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র মহামারি মোকাবেলায় আর্থিক সহায়তা দিলেও তা মূলত ধনীদের করেছে আরও ধনী।

কেয়ারস অ্যাক্ট আইনটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য একটি বেল আউট বলে ঘোষণা দেয়া হলেও নিম্ন মধ্যবিত্তদের ১২০০ ডলারের অনুদান (স্টিমুলাস চেক) আর বেকারভাতা দিয়ে ধনী ব্যবসায়ীদের জন্য দিয়েছে অন্যান্য অনেক সুবিধা। নিম্নবিত্তদের খেয়ে পরে বাঁচিয়ে রেখে, পর্দার পেছনে নানারকম কর সুবিধা ও ভর্তুকি দেয়ার মধ্যে দিয়ে ধনীদের করা হয়েছে আরও ধনী।

ওয়াশিংটন পোস্ট গত বছরের এক রিপোর্টে লিখেছে, “এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত পরিবারের সম্মিলিত সম্পদ ১২৯.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যেখানে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের কাছে আছে ৩২.১ শতাংশ, যা ১৯৮৯ সালে ছিল ২৩.৪ শতাংশ। শীর্ষ ১০ শতাংশ পরিবারের মালিকানা এখন প্রতি ১০০ ডলারের এর মধ্যে ৭০ ডলার , যা কিনা ১৯৮৯ সালে ৬১ ডলারের নিচে।

মার্কিন সম্পদের বর্তমান এই ব্যবধান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিশ্চিত একটি বাধা। মেধার এবং রিসোর্সের যথাযথ ব্যবহারের জন্য নিদেন পক্ষে একটি সহনীয় বৈষম্য মার্কিন মুলুকে এখন অনুপস্থিত। গত তিন দশকে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে, শীর্ষে কেন্দ্রীভূত হয়েছে আরও বেশি সম্পদ।

এটা কোনও কাকতালীয় ঘটনা না যে ধনীরা আরও বেশি ধনী হচ্ছে। একদিকে বিশ্বায়ন মজুরির উপর নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে আরেকদিকে নিয়ন্ত্রণহীন আর্থিক সহায়তা ব্যবসায়ীদের মূলধন লাভের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নিম্নবিত্ত মজুরেরা এখানে অসহায়।

ফোর্বস ম্যাগাজিনের দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সর্বশেষ তালিকা অনুসারে, যখন গত বছর মহামারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় অংশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, তখন ৪০০জন ধনী আমেরিকান তাদের সম্পদে যোগ করেছে ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা কিনা বৃদ্ধির পরিমাণ ৪০ শতাংশ ।

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা, জেফ বেজোস, ২০১ বিলিয়ন ডলার সম্পদের সাথে টানা চতুর্থ বছর শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন, টেসলার ইলান মাস্ক এবং ফেসবুকের মার্ক জুকারবার্গ যথাক্রমে ১৯০.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ১৩৪.৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিকানার মধ্য দিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন।

দু’হাজার সাত সালের পর যোগ হয়েছে সর্বোচ্চ সংখ্যক সুপার ধনী – ৪৪ জন নবাগত। তাদের মধ্যে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস, বিটকয়েন বিলিয়নেয়ার ক্যামেরন এবং টাইলার উইঙ্কলেভোস এবং কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নির্মাতা মডার্নার সহ-প্রতিষ্ঠাতা নওবার আফিয়ান।

বলা বাহুল্য মার্কিন দেশে কোভিড-১৯ এর দৌড়াত্ম্য শুধু ধনী- গরিবের বৈষম্যই আরও বাড়াবে না- আবারও হানা দিতে পারে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। কোভিড-১৯ সফলভাবে মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা জো বাইডেনের জন্য ওমিক্রনের বর্তমান পরিস্থিতি একটি বিপদ সংকেত।

এখনও দেশের বহু মানুষ হারিয়ে ফেলা কাজ ফিরে পায় নি। বহু মানুষ আর্থিক অনিরাপত্তার মধ্যে হাবু-ডুবু খাচ্ছে।

নিপীড়িতের জীবন বদলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা জো বাইডেন ইতিমধ্যে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। অমিক্রন তাঁর প্রশাসনের জন্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে একটি বাড়তি লিটমাস টেস্ট।

জনপ্রিয়