গিনেস বুকে উগান্ডার রোলেক্স

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২২ ৮:৩৬:৫৪ অপরাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক
বিশ্বের বৃহত্তম রোলেক্সের ওজন ২০৪.৬ কিলোগ্রাম এবং দৈর্ঘ্য ২.৩২ মিটার বা ১০ ফুট ৬ ইঞ্চি। ভাবছেন হয়ত এত ভারি এবং এত লম্বা রোলেক্স ঘড়ি মানুষ হাতে পরবে কীভাবে?

সুইজারল্যান্ডের পৃথিবীবিখ্যাত ব্র্যান্ড রোলেক্সের ঘড়ির গল্প এটা আদৌ নয়। এই রোলেক্স হল পূর্ব আফ্রিকার জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার, যা পাবেন উগান্ডায় রাস্তার ধারের দোকানে দোকানে।

উগান্ডার মানুষের মুখে মুখে শুনবেন একটা কথা: “রোলেক্স আমরা পরি না, আমরা খাই!” রোলেক্স দেশটির অতি জনপ্রিয় একটি নাস্তা – সোজা কথায় “চাপাটিতে মোড়ানো ডিম ভাজি”।

উগান্ডার সর্বত্র রাস্তার ধারের খাবার স্টলে পাবেন এই জনপ্রিয় নাস্তা ‘রোলেক্স’। চাপাটিতে মোড়া নানাধরনের সব্জি দিয়ে তৈরি ওমলেট, সাথে টম্যাটোর কুচি। সম্প্রতি গিনেস বুক উগান্ডার একটি রোলেক্সকে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করা রোলেক্সের মর্যাদা দিয়েছে।

রেকর্ড তৈরি করা রোলেক্সে কী আছে?
বিশাল ওজনের এই রোলেক্স তৈরি করা হয়েছে ১,২০০টি ডিম দিয়ে, তার সাথে ৯০ কেজি ওজনের সব্জি – পেঁয়াজ, টম্যাটো, বাঁধাকপি, গাজর আর ক্যাপসিকাম, ৭২ কেজি ওজনের ময়দা আর ৪০ কেজি রান্নার তেল।

বলাই বাহুল্য, এই বিশাল পরিমাণ ডিম রাস্তার ধারের দোকানে বসে ফেটানো অসম্ভব। সেটা হয়ওনি। ৯০ কেজি ওজনের সব্জির কুচি মেশানো বারোশ’ ডিম ফেটাতে লাগানো হয়েছে ৬০ জন মানুষকে।

উগান্ডার ইউটিউব তারকা রেমন্ড কাহুমা ডিম ভাজা আর চাপাটি বানানোর জন্য পাচকদের পরিচালনা করেছেন। ডিম ফেটানো, সব্জি কাটা, ময়দা মাখা এবং ডিম ভাজার জন্য তাদের সময় লেগেছে ১৪ ঘণ্টা। সমস্ত আয়োজন করা হয়েছে রাজধানী কাম্পালার পূবে বাইরে অস্থায়ী এক রান্নাঘরে।

বিশাল এই রন্ধনযজ্ঞের চ্যালেঞ্জ কিন্তু ছিল ব্যাপক। এর সঙ্গে জড়িত ছিল একদিকে পদার্থবিদ্যায়, অন্যদিকে রন্ধনশৈলীতে পারদর্শিতা। এখানে তো শুধু রাঁধতে জানলেই চলবে না। ৭২ কেজি ওজনের ময়দা মাখা ডেলাটাকে কীভাবে না ভেঙে তাওয়ায় তোলা হবে, এমনকী প্রকাণ্ড রোলেক্সটাকে অক্ষত রেখে কীভাবে ওজনের জন্য দাড়িপাল্লায় তোলা হবে এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় পদার্থবিদ্যার জ্ঞানেরও প্রয়োজন ছিল।

“রেমন্ড এবং তার দল এই বিশ্ব রেকর্ড গড়া রোলেক্স তৈরির সব কাজ যাতে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা যায় তা নিশ্চিত করতে কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে,” জানিয়েছে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস।

একই ধরনের একটি উদ্যোগ কিন্তু ভেস্তে যায় ২০২০ সালে। সেবার তিন হাজার ডলার খরচ হয়েছিল, জানালেন মি. কাহুমা।

”হাল ছেড়ে দেয়া মানে নিজের কাছেই হার স্বীকার করা,” ২৪ বছর বয়সী মি. কাহুমা জানিয়েছেন তার ইউটিউব চ্যানেলে। ইলেকট্রিকাল এঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলেন মি. কাহুমা। কিন্তু সেই পাঠ আর শেষ করেননি।

রোলেক্স জনপ্রিয় হল যেভাবে
মনে করা হয়, উগান্ডার খাবারের মেন্যুতে রোলেক্স প্রথম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন কাম্পালার মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুধার্ত শিক্ষার্থীদের পেট ভরাতে একজন দোকানী এই খাবারটি প্রথম বিক্রি শুরু করেন। এর পর রোলেক্সের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে।

উগান্ডায় রোলেক্স এখন খুবই জনপ্রিয় একটা নাস্তা। শহরের ফুটপাত এবং গাড়ি পার্কিংএর জায়গাগুলোয় প্রতিদিনই সন্ধ্যাবেলায় বসে দেশটির এই মুখরোচক চটজলদি নাস্তার অসংখ্য স্টল।

সন্ধ্যাবেলা দেখবেন মানুষজন কাঠকয়লার ধোঁয়া ওঠা উনান ঘিরে বসে আছেন চারপাশে পাতা কাঠের স্টুলে, তাদের অর্ডার করা রোলেক্স ভাজা হচ্ছে আর অপেক্ষমান ক্রেতারা গল্পগুজব বা আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন। সারা উগান্ডায় এটা খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য।

আরন ওডেকে বছর দশেক আগে রোলেক্স বেচার ব্যবসায় নামেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১২। আর কোন কাজ না পেয়ে তিনি এই ব্যবসা বেছে নেন।

উগান্ডার পূর্বাঞ্চলে এমবালে শহরে ইসলামিক ইউনিভার্সিটির বাইরে যে সারি সারি রোলেক্স বিক্রির স্টল আছে সেখানেই দোকান নিয়েছেন আরন ওডেকে। আরন প্রতিদিন প্রায় ১০০টি রোলেক্স বেচেন। প্রতিটি রোলেক্সের দাম তিনি নেন দুই হাজার উগান্ডান শিলিং যা ০.৫৭ ডলারের সমতুল্য। তার খদ্দেররা বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।

দ্রুত হাতে তিনি পেঁয়াজ, টম্যাটো, সবুজ ক্যাপসিকাম আর গাজর কুঁচান। খদ্দেররা চাইলে বাড়তি হিসাবে তিনি রান্না করা মাংসের টুকরোও ফেটানো ডিমে মিশিয়ে দেন।

রোলেক্স রান্না করতে হয় খুবই দ্রুত হাতে। সব উপাদান প্রস্তুত করতে তার তিন মিনিটেরও কম সময় লাগে।

রাস্তার অপর পাশে সানডে বিডোম্বার দোকান। তার বয়স ২৮। তিনি বলছেন তিনি দুভাবে রোলেক্স রান্না করেন: একটা হল পিৎসা স্টাইল – এতে চাপাটিটা টুকরো টুকরো করে কাটা হয়, তারপর সব্জি মেশানো ফেটানো ডিমে সেগুলো ডুবিয়ে অল্প আঁচে ভাজা হয়। অন্য স্টাইলটি হল সনাতনী রোলেক্স স্টাইল অর্থাৎ চাপাটির ওপর ডিম ভাজা দিয়ে সেটা রোলের মত পাকিয়ে দেয়া।

তার সন্তষ্ট খদ্দেরদের একজন আইনের ছাত্র এনসুবুগা মালে বলছেন রোলেক্স সস্তা দামের ভাজা খাবার হলেও এর মজাই আলাদা। কোন রেস্তোরাঁয় ভুরিভোজ খাবার খাওয়ার যে আনন্দ, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রোলেক্স খাওয়ার মজা তার থেকে কম কিছু নয়।

তবে, রোলেক্সের এই বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে চটজলদি এই নাস্তা এখন আর শুধু রাস্তার ধারের স্টলের মেন্যু নেই। অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোও এখন রোলেক্স পরিবেশন শুরু করেছে। তবে এসব সাজানো গোজানো দামী রেস্তোরাঁয় বসে রোলেক্স খেতে গেলে আপনাকে দাম দিতে হবে রাস্তার দোকানের প্রায় চারগুণ।

যারা হোটেল রেস্তোরাঁ আর রাস্তার স্টল দুই জায়গা থেকেই রোলেক্স খেয়েছেন, তাদের রায় হল হোটেলের বানানো রোলেক্স স্বাদের দিক দিয়ে রাস্তার দোকানের রোলেক্সের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি।

এর একটা কারণ হয়ত রাস্তার স্টলে যারা রোলেক্স রাঁধেন তাদের যাকে বলা যায় – হাতের টাচ। তারা প্রতিটা খদ্দেরের পছন্দ অনুযায়ী নানারকম রোলেক্স বানাতে বানাতে হয়ত রীতিমত হাত পাকিয়ে ফেলেছেন। উপাদানের হরেক রকম পরিমাপ, ভাজার হরেক রকম কায়দা হয়ত তারা নিখুঁতভাবে রপ্ত করে ফেলেছেন। কিংবা যারা রাস্তার দোকানে বসে খান, তাদের জন্য হয়ত চারপাশের পরিবেশ ও আড্ডার মেজাজ রোলেক্সে বাড়তি স্বাদ যোগায়।

উগান্ডায় রাস্তার এই দোকানগুলোতে যেমন দেখবেন সাধারণ মানুষের ভিড়, তেমনি অর্ডারের লাইনে দাঁড়ানো স্মার্ট স্যুট পড়া অভিজাত শ্রেণির খদ্দেরদেরও কমতি নেই এসব দোকানে।

এখন উগান্ডার এই প্রচলিত ও মুখরোচক নাস্তা গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পাবার পর উগান্ডার মানুষের আশা বিশ্বের খাদ্যপ্রেমীদের তালিকায় এবার যোগ হতে চলেছে তাদের অতি জনপ্রিয় নাস্তা – রোলেক্স।

আরো পড়ুন : অমিক্রন আক্রান্তদের দেহে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়

জনপ্রিয়