শিরোনাম

চলো সবে বই কিনি, আপনে আলো আনি

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২২ ৩:২২:২৮ অপরাহ্ণ

পারভীন আকতার
বই আমাদের জ্ঞান চোখ যা মলাটে বন্ধ থাকলে মনের ভিতর আলো প্রবেশ করে না।একটি বই একজন ব্যক্তিকে নিয়ে যায় জ্ঞানের অনন্য উচ্চতায়।জ্ঞানী ব্যক্তির কদর যুগে যুগে বাড়ে বৈ কমে না।জ্ঞানের ধাপে যে যত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে সে ততই মহৎপ্রাণের অধিকারী হয় এবং জগৎ জুড়ে খ্যাতি, সুনাম আর অমর থাকে স্বীয় কার্যকলাপে।তাই জ্ঞানের বাহন বই ছাড়া মানবজাতির কল্যাণ ও উন্নতি আর কোথাও নিহিত নেই।বর্তমানে একজন খেটে-খাওয়া মানুষও রোজে যদি দু’টি পয়সা তখন সবার আগে তার সন্তানকে স্কুলে পাঠান,বই, কলম আর খাতা কিনে দেন।বাস্তবিক পক্ষে বই ছাড়া মানুষের উন্নত জীবন গড়ার মানসিকতা তৈরি করা প্রায়ই অসম্ভব। তাই তো পড়ালেখার গুরুত্ব কতটা বুঝাতে গিয়ে সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছেন’,তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও,আমি তোমাদের শিক্ষিত একটা জাতি দেব।’আর শিক্ষিত হতে হলেই বই পড়ার বিকল্প নাই।

পেটের ক্ষিদে মেটাতে আমরা যেমন খাবার খাই তেমনি মনেরও ক্ষিদে তৃষ্ণা থাকে।জানার আকাঙ্খা বিস্তৃত বিস্তর মনের।যদিও জ্ঞানের সাগরে দিনরাত এক করে হাজারো বই পড়লে বিন্দু জল জ্ঞান অর্জিত হয় মাত্র।প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ড.হুমায়ুন আহমেদ হিমু চরিত্রের অনবদ্য স্রষ্টা বলেছেন,”একজন মানুষ তার সমগ্র জীবনে দশ হাজার বই পড়তে সক্ষম।”এর বেশি বই পড়ার সময় সুযোগ মানুষের খুব কম হয়।এখন প্রশ্ন আসে, আমরা কয় হাজার বই অদ্যাবধি পড়েছি? হাতে গুনা দশ বিশের বাইরে খুব কম মানুষই বই পড়ে।অথচ নিজেকে জ্ঞানী ভাবতে শুরু করে দিই আমরা যত সামান্য বই পড়েই।আর ভাবি পড়ালেখার সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছি কি না পড়েই?ভিতরে একটা অহংবোধ চলে আসে মানুষের।

কম পড়লেও পড়াকে এগিয়ে নিতে আমরা কেন যেন সচেষ্ট নই যেমন ইলিশ মাছ খাওয়ার ব্যগ্রতা আমাদের তার চেয়েও প্রবল।ফ্যাট হলেও ক্ষতি নেই।খেতেই হবে।কিন্তু মনের খাবার জোগান দেবে কীসে তা আমরা ভাববার সময় পাই না আর এই অভাবকে গ্রাহ্যও করি না।তাইতো একটি বই শ’খানেক টাকায় কিনে পড়ার মানসিকতাও আজো আমাদের তৈরি হচ্ছে না।মন বলে কিছু যে আছে তা প্রেমে পড়লে,বিশ্বাসঘাতকতায় ছ্যাকা খেয়েই বুঝে মানুষ।কিন্তু বইয়ের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করলে মন সবল থাকে,মানসিক দৃঢ় শক্তি জোগান দেয় বইয়ের প্রতিটি শব্দ।মানুষ মনের দিকে প্রবল বেগ পেলে হিমালয় ডিঙিয়ে যেতে সাহস করে।দূর্বল চিত্ত মাঝিনিহীন নৌকার মত। আর এই থেকে মুক্তি পেতে বই কিনেই পড়তে হবে,মনের প্রশান্তি বাড়বে আর বইকে ঘিরে স্বপ্ন বুনন চলবে।বই সুপথ দেখায়,পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তি ও বুদ্ধির দুয়ার খুলে দেয়।চৌকস হতে শিক্ষা দেয় বইয়ের প্রতিটি লাইন।

ধরুন আপনার বন্ধুদের নিয়ে একটি চায়ের দোকানে বসলেন।খাওয়ার বিল দিলেন তিনশো টাকা।তারপর সব বন্ধুরা আপনাকে ছেড়ে একেক করে চলে গেল।আপনি সেই একাই রয়ে গেলেন।আফসোস করে বন্ধুদের যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করে মন খারাপ করছেন।আর জোর দিয়ে তাদের বলতেও পারছেন না আরেকটু বসতে।কারণ সবারই পরিবার আছে,কাজকর্মতো আছেই।নীড়ে ফিরতেই হবে।কিন্তু সেই তিনশো টাকা দিয়ে যদি আপনি একটি বই কিনতেন তাহলে সেই বইটা আপনার চিরস্থায়ী বন্ধু বনে যেত।সার্বক্ষণিক আপনি বইটি পাশে পেতেন।বইয়ের ভিতর প্রতিটি শব্দ আপনার আজীবন বন্ধু হতো।সুখের কথা হলে হাসতেন আর দুঃখের কাহিনী হলে কেঁদে বুক ভাসিয়ে হালকা হয়ে যেতেন।আর জ্ঞান আলোয় আপনি পূর্ণ হতেন যা জীবনে প্রতিটি মুহুর্তে সহায়তা করত।

ইতিহাসের পাতা খুলতে বই লাগেই।অতীত জানতে,বর্তমান সাজাতে আর ভবিষ্যৎ বিনিমার্ণে বই একটি একক ও অনন্য সত্ত্বা।আমাদের পবিত্র কোরআন,বাইবেল,ত্রিপিটক সবই কিন্তু পবিত্র বই।প্রতিটি মানুষ শুদ্ধ হতে আমরা ধর্মীয় বই পড়ি আর নিজেদের ন্যায় নিষ্পাপ রাখার চেষ্টা করি।তাহলে বইয়ের গুরত্ব মানুষের জীবনের শেষাবধি আছেই।যত বই পড়বেন ততই জীবন চলার পথ সুগম হবে,আমরা মানুষের চলা বলা,মনের গতির আওয়াজ বুঝতে সক্ষম হব।মানুষ ওয়াজ মাহফিল করে, কঠিন চিবর দান,মুনী ঋষীর কথা শ্রবণ করে,দূর্গা আরাধনা করে ভাল কিছু পুস্তক ও তার সমন্নয়ক ব্যক্তির নিজের জ্ঞানমূলক কথা,বাণী শোনার জন্য।এতে মানুষ প্রশান্তি লাভ করে।আর বক্তা প্রচুর বই পড়ে,গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন।তাই বই কিনে পড়াকে কখনোই লস প্রজেক্ট মনে করেবন না।একাগ্র চিত্তে বইকে বন্ধু করলে হলফ করে বলতে পারি নিজেকে কখনোই আর একা বোধ করবেন না।অন্ধকার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে আপনার জন্য।

বর্তমানে তরুণরা খুব সহজে মোবাইলে সেটে যেভাবে আসক্ত তাতে অধুনা বিশ্বে কী ভয়ানক খারাপ পরিবেশ ও চৌকসতার স্থবিরতার কালো অমানিশা নেমে আসছে তা হয়তো আজ আমরা বুঝতে ও যথাযথ উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছি না।কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে এভাবে চলতে থাকলে এই উন্নত বিশ্ব একসময় মুখ তুবড়ে পড়বে সেদিন কিন্তু বেশি দূরে নয়।আর এসব থেকে একমাত্র মুক্তিদাতা বই।অবশ্যই একটি ভাল বই জীবনসমৃদ্ধ করবে,আলোকিত করবে।জীবনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে একটি বাজেট রাখুন বই কিনতে,প্রিয়জনকে বই উপহার দিতে।বইমুখী করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।আপনার সন্তানকে হাতে মোবাইল না দিয়ে ভাল একটি বই দিন।তাকে উৎসাহিত করুন বই পড়তে।প্রয়োজনে আপনি নিজে সময় নিয়ে পরম স্নেহে সন্তানকে বসিয়ে বই পড়ে শোনান।অবশ্যই এই রকম পরিবেশ ঘরে তৈরি করলে বাবা মা অবসরে বই হাতে দেখলে সন্তানরাও বই হাতে নেবেই।মানুষ অনুকরণ প্রিয়।উপদেশের চেয়ে ভাল দৃষ্টান্ত হওয়া শ্রেয়।সন্তানদের সারাদিন পড় পড় করলে তারা কখনোই পড়বে না।বই পড়ার মজাটা তাদের হাতে কলমে বুঝিয়ে দিতে হবে।বই পড়ে মনালোকিত করতে পারলে আমরা জীবনের লোভ লালসা,ক্ষমতার লিপ্সা,অপরাধ করার মানসিকতা থেকে মুক্তি পাব।পৃথিবীর ক্ষণিকের স্থায়ী জীবনকে লোলুপতা,ষড়রিপু থেকে মুক্তির পথ বই সঙ্গ। আসুন আমরা বই কিনি,মন দিয়ে বইয়ের বার্তা পড়ি,মনে প্রশান্তি আনি।বই কিনে ঠকবেন না বরং জিতে যাওয়ার কৌশল শিখবেন,ধৈর্যশীলতা বাড়বে এবং মনের দৃঢ় মনোবল পরাক্রম শক্তি জাগ্রত হবে।
“চলো সবে বই কিনি,
আপনে আলো আনি।”

শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক

আরো পড়ুন : বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

 

সর্বশেষ

জনপ্রিয়