তৃষিতের শরাবান (৩য় পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বুধবার, এপ্রিল ২৪, ২০১৯ ৩:৩৮:৩৮ অপরাহ্ণ
Trisiter Saraban

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে। একটু পরই জেগে উঠবে পুরো শহর। কোলাহলে পূর্ণ হয়ে যাবে গলি থেকে রাজপথ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত। সর্বত্রই ব্যস্ততা আর ব্যস্ততা। তবে এই ব্যস্ত কর্মটি সবার আগে শুরু করেন পত্রিকার হকাররা। কাকডাকা ভোরে সাইকেল করে, পায়ে হেঁটে বাসায় বাসায় দরজার নিচ দিয়ে সংবাদপত্র রেখে আসেন। সোমা কেবিন থেকে বেরিয়ে নিচে নামে। কয়েকটি পত্রিকা কিনে কেবিনে ফিরে আসে।

সকাল আটটা নাগাদ চোখ খোলে সজীব। সেলাইনটা শেষ হয়েছে। সমস্ত শরীর ব্যাথায় টন্ টন্ করছে। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। শরীরটা এত দুর্বল হয়েছে যে, বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। দায়িত্বরত ডাক্তার এসেছেন। সাথে নার্স লিপি। মেয়েটি সারা রাত ঘুমায়নি। কখন ডাক পড়ে সেই অপেক্ষায় জেগে ছিল। সজীবের মাথায় হাত রাখে লিপি। থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর পরীক্ষা করে। এক’শ দুই ডিগ্রি। ডাক্তারকে একটু চিন্তিত মনে হয় সোমার কাছে। সজীবকে ভালো করে গোসল করিয়ে নাস্তা করার পর সকালের ডোজ দিতে বলে। যাবার সময় বলে যায়, আপনি চিন্তা করবেন না, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার বের হতেই সোমা পিছন পিছন বেরিয়ে যায়। রোগীর অবস্থা জানতে চাইলে ডাক্তার বলে, রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না। রিপোর্ট কখন পাওয়া যাবে জানতে চাইলে ডাক্তার উত্তরে বলেন, বিকেলে পাওয়া যাবে।

সোমা কেবিনে ফিরে আসে। সজীব ওয়াশরুমে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লিপি। সোমার মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয় রিপোর্টের জন্য। হঠাৎ করে সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কিন্তু কেন এতো বেশি চিন্তিত হচ্ছে সজীবের জন্য, সেটা বুঝতে পারে না। মনের মধ্যে কান্নার শব্দ শুনতে পায়। যদিও কারণটা জানা নেই।

সজীব ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় বসে। লিপির দিকে তাকায়। কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই লিপি বলে, স্যার আমরা ওয়ার্ডে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ম্যাডাম…
সজীব দৃষ্টি ফেরায় সোমার দিকে। নেতিয়ে পড়া রজনীগন্ধার মতো দাঁড়িয়ে আছে সোমা। সামনে এগিয়ে সামনা সামনি হয়ে বলে, হ্যাঁ, আমিই বলেছি। প্লিজ, আপনি কিছু মনে করবেন না।
-তা না হয় করলাম না। কিন্তু আপনি এখানে?
-না, মানে, এমনিই। আপনি আরাম করুন।
-সারা রাত কী লিখলেন?
-না না, তেমন কিছু না। আপনি কথা বলবেন না প্লিজ। শান্ত থাকুন। আপনি আগে সুস্থ হোন, তার পর অন্য সব।
আসমা টিফিন কেরিয়ার করে বাসা থেকে স্যুপ, রুটি আর সবজী রান্না করে নিয়ে এসেছে। বেশ চটপটে মেয়েটি। ঢুকেই লম্বা সালাম দিয়ে সজীবের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন করে, এখন কেমন আছেন স্যার?
-ভাল। সজীব উত্তর দেয়। সোমাকে উদ্দেশ্য করে আসমা বলে, ম্যাডাম আপনিও হাত, মুখ ধুঁয়ে আসেন। সারারাত আপনিও কিছু খাননি। আসেন খেয়ে নেন। সোমা অবাক দৃষ্টি মেলে মেয়েকে অসাপ্ত প্রশ্ন করে, আপনি…?
-স্যার এখানকার খাবার খেতে পছন্দ করেন না। তাই বাসা থেকে নিয়ে এসেছি। এবার সাত মাস পর এলেন। সুস্থ থাকতে তো খাওয়াতে পারি না। রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা শুধু কাজ আর কাজ। দাওয়াত দিয়েও বাসায় নিতে পারি নাই। এত কাজ করতে পারেন অথচ নিজের শরীরের প্রতি একটুও খেয়াল রাখেন না।

আসমার কথায় সজীবের শুস্ক ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। আর সোমার চেহারায় ফুটে ওঠে কিংকর্তব্যবিমূড়তার ছাপ। নির্বাক মূর্তিমান পাথরের মতো হয়ে যায় সোমা। নার্সদের আচরণ আর আবেগে নিজেকে সামলাতে পারে না। চোখ জোড়া জলে ভরে ওঠে। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। বেশি করে পানি দেয় মুখে। বুক ফেটে কান্না আসছে, কিন্তু কাঁদতে পারছে না। অনেক দিন হয় সোমার চোখে জল আসে না। মা মারা যাওয়ার পর খুব কেঁদেছিল। বাবার আদরে খুব দ্রুতই সে কান্না থেমে গিয়েছিল। তার পর আর খুব একটা কাঁদেনি। তথাকথিত কবির সাথে প্রেমের বিচ্ছেদের পর খুব মন খারাপ হয়েছিল, কিন্তু কাঁদেনি। বরং স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিয়েছে অন্তর থেকে এমন একটা মানুষকে জীবন সঙ্গিনী করতে হয়নি। কিন্তু আজকে আর নিজেকে সামলাতে পারছে না। ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে। একজন মানুষ, একজন লেখক, একজন নামকরা কবির ব্যক্তি-জীবন যে এতো কষ্ট আর সুখের বৈচিত্রে ভরা- তা জানা ছিল না। মনে মনে ধিক্কার দেয় সজীবের স্ত্রীকে। যে কিনা এমন মানুষটিকে চিনলো না, বুঝলো না। শুধুমাত্র নিজের আত্মঅহমিকার জন্য এমন একজন ভালো মানুষকে অনাদরের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করলো!

-ম্যাডাম, তাড়াতাড়ি আসেন, খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না।
আসমার ডাকে তড়িঘড়ি করে মুখ মুছে বেরিয়ে আসে। সজীব অপেক্ষায় আছে খাবার নিয়ে। আসমা সোমার দিকে প্লেট এগিয়ে দেয়। সজীবের মুখের রুচি নামক বিষয়টি জ¦রের প্রকোপে হারিয়ে গেছে। দুবার মুখে দেয়ার পর আর খেতে পারে না। লিপি, আসমা নানাভাবে বোঝায় খাওয়ার জন্য। অবশেষে কোনো রকমে একটি রুটি খেয়ে ঔষধ খেয়ে শুয়ে পড়ে। (চলবে…)

আরও পড়ুন:তৃষিতের শরাবান (২য় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ

জনপ্রিয়