তৃষিতের শরাবান (৪র্থ পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, এপ্রিল ২৮, ২০১৯ ৫:১৭:৪৮ অপরাহ্ণ
Trisiter Saraban

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
দুপুর সাড়ে বারটার দিকে হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে ঢোকে সোমা। এক হাতে কয়েকটি শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। সোমা দেখতে পায় সজীবের মাথা আর কপালে আসমা হাত বুলাচ্ছে। যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে এপাশ-ওপাশ করছে সজীব। জ¦র আছে। সারা শরীরের সাথে সাথে মাথাটাও ভীষণ যন্ত্রণা করছে। সোমা কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আসমার কাছে জানতে চায়, কখন থেকে এ অবস্থা। উত্তরে আসমা বলে, এই তো আধা ঘন্টা হলো।
-ডাক্তার এসেছিলেন?
-হ্যাঁ।
-কী বললেন উনি?
-সাপোজিটার দিয়ে গেছেন। বলেছেন, জ¦রটা কমলে ভালো করে গোসল করিয়ে খাবারের পর যেন দুপুরের ঔষধ খাইয়ে দেই।

সোমা হাতের ব্যাগগুলো ও টিফিন ক্যারিয়ার টেবিলের ওপর রেখে সজীবের পাশে গিয়ে বসে। ডান হাতটা ধরে। সজীব পাশ ফিরে সোমার চোখে চোখ রাখে। চৌদ্দ বছর আগে একবার প্রেমের আবেগে ভন্ড কবির হাত ধরেছিল সোমা। বিনিময়ে সে যেভাবে সোমার হাত ধরেছিল, সেটা ছিল সোমার কাছে অত্যন্ত অশোভন আর অসভ্যতা। ঝটকা মেরে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়েছিল সেদিন। আর কোনদিন ধরেনি। সোনালি স্বপ্ন ধূসর হওয়ার পর থেকে একাকিত্বকে আপন করে বাবার সাথে চলে যায় আমেরিকায়। এক সময় সজীবের ঠান্ডা হাতের শীতল স্পর্শ অনুভব করে সোমা। জ¦রটা ছাড়ছে। মুহূর্তের মধ্যে সোমার চোখে মুখে ভেসে ওঠে অদৃশ্য আনন্দের ঝিলিক।

সোমা সজীবকে বলে, উঠুন, গোসলটা সেরে নিন। ঔষধ খাওয়ার সময় হয়েছে। সজীব আস্তে আস্তে বিছানা থেকে ওঠে। সোমা ব্যাগ থেকে হালকা সবুজ রঙের স্লিপিং স্যুট আর তোয়ালে বের করে সজীবের হাতে দেয়। সজীব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সোমার দিকে। প্রেমের পরশে মানুষ অনেক সময় অসাধ্য সাধন করতে পারে। ভালোবাসা আর আদর পেলে রোগ বালাইও অর্ধেক কমে যায়। বৃদ্ধি পায় নতুন সঞ্জিবনী শক্তি আর মানসিক দৃঢ়তা। অজেয়কেও জয় করা তখন হয়ে যায় অনেক সহজ। আজ সেই ভালোবাসাই হারিয়ে গেছে সজীবের জীবন থেকে। দেহ আছে কিন্তু প্রাণের অস্তিত্ব নেই। নিজেকে কখনো মনে করে জীবন্ত মমি। আবার কখনো বা মনে হয় ডাক্তারের চেম্বারে ঝোলানো এক জীবন্ত কঙ্কাল।

কী ব্যাপার, গোসলটা সেরে নিন? ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। সোমার আদেশে ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যাওয়া ভাবনা থেকে ফিরে আসে সজীব। বাথরুমের দিকে এগোতেই সোমা বলে, একটু দাঁড়ান; বলেই টেবিলে রাখা অন্য একটি ব্যাগ থেকে টুথব্রাশ, পেস্ট, শ্যাম্পু আর সাবান এগিয়ে দেয়। অবাক হওয়ার মাত্রাটা ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে সজীবের। সজীব দাঁত ব্রাশ করে, শ্যাম্পু-সাবান মেখে ভালো করে গোসল করে। গোসলের পর সে বেশ আরামবোধ করে। নতুন স্লিপিং স্যুট পরে বাইরে বেরুতেই দরজার সামনে দেখে একজোড়া নতুন স্যান্ডেল। পায়ে দেয়ার আগে সোমার দিকে তাকায়। সজীব সোমাকে ঠিক বুঝতে পারছে না। কী চাচ্ছে সে? এতকিছু করার কারণটাই বা কী? জিজ্ঞেস করার সময়ও এটা না। সজীব বিছানায় গিয়ে বসে। সোমা পার্স থেকে চিরুনি বের করে এগিয়ে দেয়। চিরুনিটি নিতে নিতে সজীব কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই সোমা বাধা দিয়ে বলে, এখন কিছু বলতে হবে না। কোনো কিছু বলতে চাইলে বা বকতে ইচ্ছে করলে ওগুলো পরেও করতে পারবেন। আগে সুস্থ হয়ে উঠুন।

সোমা টিফিন ক্যারিয়ার থেকে চিকন চালের ভাত, কাজলি, মলা আর পবদা মাছের তরকারি বের করে। সাথে সবজি আর ডাল। প্লেটে খাবার তুলে দেয়ার সময় আসমা বলে, ম্যাডাম, আপনি তো গেলেন সাড়ে নয়টায়, আসলেন সাড়ে বারটার সময়। এরই মধ্যে এতো কিছু করলেন কীভাবে? উত্তরে সোমা বলে, আমি শুধু শপিংয়ে গিয়েছিলাম। আমার এক ফুফু আছেন। উনাকে ফোনে বলেছিলাম। উনিই কাছের বাজার থেকে কিনে রান্না করে দিয়েছেন।

সজীব ভাতের প্লেট সামনে নিয়ে তাকিয়ে থাকে সোমার দিকে। বাসায় গিয়ে গোসল করে বোধ হয় ঠিকমতো মাথা মোছেনি। চিরুনিও দেয়নি। কানের দুপাশ দিয়ে টপ্্ টপ্্ পানির ফোঁটা পড়ছে। ভিজে যাচ্ছে গোলাপি রঙের কামিজ। কিন্তু কেন? কেন এসব করছে সে আমার জন্য? আমাকে কী করুণা করছে? কিন্তু আমি তো কারো কাছে করুণা চাই না। শুধু ভালোবাসা চেয়েছিলাম। তাও আমার নিজের স্ত্রীর কাছে। বঞ্চিত হয়েছি বলে দুঃখবোধ থাকলেও কাউকে বুঝতে দেইনি। কারণ, জানলে হয়ত অনেকেই করুণা দেখাতো।
-কী ব্যাপার, খাচ্ছেন না যে? সোমা প্রশ্ন করে।
-হ্যাঁ খাচ্ছি। আপনি খাবেন না?
-হ্যাঁ খাবো। এই তো আমি নিচ্ছি। আসমা তুমিও খেয়ে নাও আমাদের সাথে।
সজীব বলে, হ্যাঁ তুমিও খেয়ে নাও আসমা।

এক জীবনে এতো বৈচিত্র। ছোটবেলার দুরন্তপনা। হাসি আর উচ্ছ্বাসে গোটা বাড়ি মাতিয়ে রাখা; স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণবন্ত কিশোর, যুবক; অমোঘ প্রেমের কাছে পরাভূত হয়ে মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষার পর কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই বিয়ে করা; অতঃপর কর্মসংস্থান; পরীক্ষার রেজাল্টের আগেই সন্তানের জন্ম- জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সুখের নির্ভিক বিচরণ। তারপর হঠাৎই ছন্দপতন। আংশিক বেকার হয়ে যাওয়া; সংসারে ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে আয় কমে যাওয়া; অভাব আর দারিদ্রের কাছে ক্রমেই মিলিয়ে যেতে থাকে প্রেম, হাসি আর উচ্ছ্বলতা। স্ত্রীর শিক্ষকতা পেশা শুরু; মহৎ পেশার রোজগারে অহংকারী হয়ে ওঠা; ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব।

এক সময় নিজেকে আবিষ্কার করে, নিঃসঙ্গ জীবনের যাত্রি হয়ে গেছে সে। গত তিন বছর ধরে সকালের নাস্তা হোটেলে, দুপুরে মাসিক চুক্তিতে মহিলার রান্না করা খাবার আর রাতে অভুক্ত- এই তো সজীবের দিনলিপি। কোন আত্মীয়ের বাড়ি যায় না। কারণ, গেলেই জিজ্ঞেস করে, একা এলি, বউ-ছেলেকে নিয়ে আসলি না কেন? মিথ্যে বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেছিল সজীব। (চলবে…)

আরও পড়ুন: তৃষিতের শরাবান (৩য় পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়