নবীর জীবন, আমাদের জন্য শিক্ষনীয় (২য় পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, মে ২১, ২০১৯ ১২:১২:৪১ অপরাহ্ণ
Mohammad s.
হজরত মোহাম্মদ স. এর রওজা পাকের প্রধান ফটক। ছবি : সংগৃহীত

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
নবীর জীবন, আমাদের জন্য শিক্ষনীয় এর গত পর্বে ছিল নবী করিম স. জন্ম থেকে নবুয়তের আগ পর্যন্ত বিষয়ে আমাদের শিক্ষনীয়। আজ থাকছে পরবর্তী বিষয়গুলো।

(২) নবুয়ত প্রাপ্তির পর হতে মদীনায় হিজরতে আগ পর্যন্ত:
মক্কাবাসীর সকল গোত্রের প্রতিটি লোকের কাছেই যে ব্যক্তিটি আল আমিন হিসেবে পরিচিত সেই ব্যক্তিই যখন আল্লাহ কর্তৃক অহীপ্রাপ্ত হয়ে ইসলামের কথা বললেন, মূর্তি পুজার পরিবর্তে এক আল্লাহর ইবাদত করতে এবং নিজেকে নবী হিসেবে স্বীকার করে নিতে বললেন, তখন মক্কার প্রতিটি লোক এর বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগলো। চল্লিশ বছরে যে ব্যক্তি কোনদিন একটিও মিথ্যা কথা বলেননি বলে তাদের কাছে প্রমাণ ছিল, সেই তারা আবার মুহূর্তের মধ্যেই নবী মোহাম্মদ স. কে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করলো। ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিধর্মীদের কাছে নানাভাবে নাজেহাল হতে হলো। এমনকি তায়েফে নবী মোহাম্মদ স. এর পবিত্র রক্তে রঞ্জিত হলো উত্তপ্ত বালু। তবে এতকিছুর পরও নবী মোহাম্মদ স. কখনো কারও প্রতি রাগ হন নি, অভিশাপ দেন নাই। ধৈর্য্য ধারণ করে শুধু আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছেন।

শিক্ষনীয়:
নবী মোহাম্মদ স. ছিলেন ধৈর্য্যশীলতার মূর্তপ্রতীক। শত বাঁধা বিপত্তি সত্বেও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্তা রেখে পথ চলেছেন। অন্যান্য নবীদের সময় জুলুমকারীদের আল্লাহ শাস্তি দিয়েছেন, সমুলে ধ্বংস করেছেন এমনও নজির আছে। কিন্তু আখেরী নবী নির্যাতনকারীদের কখনো অভিশাপ দেননি বরং হেদায়েতের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন। একজন মুসলমান হিসেবে সবারই এই গুণটি থাকা অপরিহার্য।

(৩) মদীনায় হিজরতকালীন সময়:
মূলত: মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর হতেই ইসলামের প্রচার প্রসার ঘটতে থাকে তীব্র গতিতে। সেখানে তিনি সকল গোত্রের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। নিজের মেধা, মননশীলতা, স্বভাবসূলভ বিনয়ী আচরণ দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সকল জাতি তথা গোষ্ঠীর মানুষকে। এখানে নবী মোহাম্মদ স. কে একজন দক্ষ সংগঠকের ভুমিকায় দেখা যায়।

শিক্ষনীয়:
নিজেকে মেলে ধরার জন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট, বিনয়ী আচরণ, রাজনৈতিক দুরদর্শিতা, সৃষ্টিশীল মেধার কোন বিকল্প নেই। যার মধ্যে এই গুণগুলি থাকবে সে নি:সন্দেহে সমাজে তথা আল্লাহর কাছে প্রিয়ভাজন হবেন।

(৪) মক্কা বিজয়:
বদর যুদ্ধের মাধ্যমে নবী মোহাম্মদ স. এর মাঝে একজন দক্ষ সেনাপতির চরিত্র ফুটে উঠে। অসাধারণ রণকৌশল, অমিত সাহস, অনুগত সাহাবীদের মাঝে যুদ্ধ জয়ের আকাঙ্খা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে তিনি অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন। নবী মোহাম্মদ স. এর সময় ছোট বড় মিলিয়ে ৮২টি যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এর মধ্যে নবীজি ৮টি যুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর সময়োপযোগী রণকৌশলের কারণে কোন যুদ্ধে তিনি পরাজিত হননি। শত্রুবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হওয়া সত্বেও মুসলমানদের বিজয় ঠেকানো যায়নি।

শিক্ষনীয়:
প্রয়োজনের তাগিদে, ইসলামের উপর আঘাত আসলে তার প্রতিঘাত করা সকল মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে অবশ্যই সেনাপতি নবী মোহাম্মদ স. কে অনুসরণ করতে হবে এবং সাহাবীদের চরিত্রের ন্যায় নিজেকে সর্বদাই প্রস্তুত রাখেতে হবে। সে সময় ইসলামের সরাসরি বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধে স্বশ¯্র প্রতিরোধের কোন বিকল্প ছিল না। কিন্তু বর্তমান আধুনিক যুগে বিধর্মীরা বিভিন্নভাবে ইসলামের বিরুদ্ধেচারণ করছে। প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার ইসলাম বিরোধী বই, পুস্তক, লিফ্লেট, পুস্তিকা প্রকাশ করছে। ইসলামকে হেয় করার জন্য ব্যবহার করছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে। আমাদের উচিত এ সকল ইসলাম বিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে একই পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করা এবং এ সকল অপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ধর্মপ্রাণ সকল মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব।

(৫) মক্কা দখল ও সফল রাষ্ট্রনায়ক:
মক্ক দখলের পর নবী মোহাম্মদ স. আরবের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ইসলাম আবির্ভাবের সূচনালগ্নে যারা নবীজির বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন তাদের মধ্যে যারা ক্ষমা প্রার্থনা করলেন তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এদের মধ্যে নবীজির প্রিয় চাচা হযরত আমীর হামযা রা. এর হত্যাকারী ওয়াহশী ও হযরত হামযার রক্ত পানকারী হিন্দাও ছিলেন। শুরু হয় তাঁর শাসক জীবন। এ সময় তিনি ইসলামী আইন দ্বারা দেশ পরিচালিত করেন। তিনি তাঁর শাসনামলে ইসলামের প্রচার হয়েছে যেমন পৃথিবীর সর্বত্র তেমনি শাসক হিসেবে দিয়েছেন আরববাসীদের সুখ ও শান্তির পরশ। এসময় ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন তথা এমন কোন দিক নেই যেখানে ইসলামের সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা তিনি দেননি। এবং এই দিক নির্দেশনা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহর প্রিয় বন্ধু মোহাম্মদ স. বিদায় হজের মাধ্যমে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে ঘোষণা করেন। রেখে যান আল্লাহ প্রদত্ত সর্বশেষ আসমানী কেতাব ‘আল কোরআন’ যা কিনা মুসলমান তথা সকল মানবকুলের জন্য ‘পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা’ হিসেবে গণ্য এবং মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য সংববিধান স্বরূপ। অনুকরণীয় হিসেবে রেখে যান নবীজির ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি দিক তথা হাদিস সমূহ।

শিক্ষনীয়:
নবী মোহাম্মদ সা. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল। অন্যায় যত বড়ই হোক না কেন অন্যায়কারী ক্ষমা প্রার্থনা করলে ক্ষমা করে দেয়া মুসলমানের সুন্দর চরিত্রের বহি:প্রকাশ। নবুওয়তের পর থেকে বিদায় হজ পর্যন্ত সময়ে ক্রমান্বয়ে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে। মুসলমানদের জন্য আসমানী কিতাব কোরআন পূর্ণাঙ্গরূপে নাজিল করা হয়। আমাদের জন্য বিদায় হজের মর্ম অনুধাবন পূর্বক জীবন পরিচালিত করা উচিত। একমাত্র ইসলাম ধর্মই দিতে পারে জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুখ ও শান্তির ছোঁয়া।

আমাদের পথ চলতে হবে আল কোরআন এবং প্রিয় নবীর হাদিস অনুযায়ী। ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উভয় জগতেই সর্বময় কল্যাণ নিহিত আছে এই দু’য়ের মাঝে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ তথা রাষ্ট্রের এমন কোন দিক নেই যেখানে কোরআন ও হাদীসে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের চলতে হবে কোরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী। কিন্তু আমাদের সমাজে ও দেশের মুসলমানেরা কতটুকু পালন করতে পারচে সে বিষয়েই আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

(আগামীকাল থেকে থাকছে, আমাদের ব্যক্তিগত তখা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের প্রভাব কতটুকু- তা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন)

আরও পড়ুন >>

নবীর জীবন, আমাদের জন্য শিক্ষনীয় (১ম পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ম পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (২য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৩য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৪র্থ পর্ব)

হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৫ম পর্ব)

হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (শেষ পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়