প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা প্রতিরোধে করণীয়

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৫, ২০২২ ৭:৩৩:৩৩ অপরাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক:
সন্তান প্রসবের পর মা ও শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে উপেক্ষিত থাকে মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য।সদ্য প্রসূতি মায়েদের অনেকেই প্রসব-পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হন যা একই সাথে মা ও শিশু দু’জনের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন একজন সদ্য প্রসূতি মা যেন বিষণ্ণতায় না ভোগেন এবং তিনি যেন শিশুর নিবিড় যত্ন নিতে পারেন – এ কারণেই প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় পরার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা কেন হয়?

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে- অনেক নারীর মধ্যেই সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপর তাদের আচরণে দুঃখবোধ কিংবা শূন্যতা অনুভব এবং অতিরিক্ত আবেগ-প্রবণতা দেখা যায়, যা স্বাভাবিক একটি বিষয়।

কিন্তু যদি সন্তান জন্মদানের পর দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে মন খারাপ, অতিরিক্ত মেজাজ এবং অসহায় ভাব থেকে যায়, তবে তিনি প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন।

বিশেষত সন্তান জন্মদানের পর নারীর দেহে হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও এই ডিপ্রেশন হতে পারে। সন্তান জন্মদানের পর সবচেয়ে বড়ো শারীরিক পরিবর্তন হচ্ছে শরীরে বিভিন্ন হরমোন এবং তাদের পরিমাণ বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া।

গর্ভবতী হওয়ার সময় থেকেই নারীদের শরীরে এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, যা সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্ণতা হতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.আরমানা ইসলাম বলেন সব মা যে প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগেন তেমনটা নয়। তবে যারা ভোগেন তাদের আগে থেকেই কিছু শারীরিক এবং মানসিক কারণ থাকতে পারে। যেমন :

* কম থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা

* ঘুম কম হওয়া (sleep deprivation)

* অপর্যাপ্ত খাদ্য

* অন্তর্নিহিত অসুখ

* মাদক ব্যবহার

* মানসিক কারণ

যদি আগে থেকে পরিবারে যেকোনো মানসিক ব্যাধি থেকে থাকে তাহলে নারীর প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে পারিপার্শ্বিক যেসব কারণে মানসিক চাপ হতে পারে:

* সাম্প্রতিক বিবাহবিচ্ছেদ

* প্রিয়জনের মৃত্যু

* মা বা সন্তানের গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা

* সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

* আর্থিক অনটন

* সহযোগিতার অভাব

* ‘মনে হল আমার বেঁচে থাকার কোন দরকার নেই”

বছর তিনেক আগে প্রথমবারের মত মা হয়েছিলেন সালমা আক্তার ( ছদ্মনাম)। সি-সেকশনের মাধ্যমে তিনি মা হন। সন্তান প্রসবের আগে পুরো সময়টা তাকে নানা ধরনের জটিল শারীরিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “একটা সময় ডাক্তার আমাকে বেড-রেস্টে থাকতে বলেন। আমি দীর্ঘ ছয়মাস বিছানায় শুয়ে ছিলাম। তখনই আমি বিষণ্ণতায় ভুগতাম। আমি আমার পরিবারকে বলতাম কিন্তু তারা বলতো এই সময় এমনটাই হয় সব মেয়ের।”

এর পর তিনি তার সমস্যার কথা বলা ছেড়ে দেন।তার প্রসবের সময় বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়। ফলে মা এবং শিশুকে আলাদা রাখতে হয়। অবশেষে যখন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরেন, তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাচ্চাকে নিয়ে।

তিনি বলেন, “আমি যে একটা মানুষ, তখনো অসুস্থ, দেখলাম কেউ তা নিয়ে ভাবছে না। উল্টো আমাকে বলছে কেন আমি সঠিক সময় বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারছি না, কেন বাচ্চা কাঁদছে আরো অনেক কিছু।”

“আমার খাবার-দাবারের প্রতি খেয়াল রাখেনি কেউ। এদিকে আমার বুকের দুধ কমে যেতে থাকে। সেটা নিয়েও কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু তাদের যখন বললাম বুকের দুধ বাড়াতে হলে আমাকেও খেতে হবে পর্যাপ্ত, তারা তাতে ভ্রুক্ষেপ করলো না,” বলেন তিনি।

একদিন সন্ধ্যায় তিনি অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেললেন। তার ভাষ্যমতে রাত দু’টার দিকে তার স্বামী তাকে ডাকতে থাকেন, কিন্তু কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে বুঝতে পারে কোন একটা সমস্যা হয়েছে।

সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তখন আমার স্বামী এবং তার মা আমার সঙ্গে পশুর মত আচরণ করছিল। তারা আমাকে মানসিকভাবে পর্যদুস্ত করার জন্য যত কথা আছে সব বললো। এতে আমার মধ্যে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হলো।”

“শেষ রাতের দিকে মনে হল আমার বেঁচে থাকার কোন দরকার নেই। আমি যেভাবে ছিলাম সেভাবেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম। সবাই তখন ঘুমে। আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি, কী করছি। দুপুরের দিকে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আমি আমার বোনের বাড়িতে।”

“আমার বোন বললো ভোরে একটা সিএনজি নিয়ে খালি পায়ে উশকোখুসকো চুলে বাসার জামা পরে আমি তাদের বাসায় যাই। কিন্তু এর কিছুই আমি মনে করতে পারি নি। সেদিন আমি মারা যেতে পারতাম,” বলেন তিনি।

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্ণতার কিছু লক্ষণ:
* অস্থির লাগা বা মেজাজ খারাপ হয়ে থাকা

* কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ বা কান্না আসা

* অতিরিক্ত ঘুম হওয়া অথবা প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগলেও ঘুম না আসা

* খুব কম খাওয়া কিংবা অতিরিক্ত খাওয়া

* নানান ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব হওয়া

* সবকিছু অতিরিক্ত মনে হওয়া এবং হতাশ লাগা

* নিজেকে অসহায় লাগা

* মনোনিবেশ করতে বা সহজ সিদ্ধান্ত নিতে না পারা

* যে জিনিসগুলো এক সময় উপভোগ করতেন তাতে কোনো আগ্রহ না থাকা

* কাজে শক্তি বা অনুপ্রেরণা না পাওয়া

* শিশুকে বা নিজেকে আঘাত করার কথা চিন্তা করা

* সন্তানের প্রতি আগ্রহ কাজ না করা, তার থেকে দূরে থাকা। অর্থাৎ এমন মনে হওয়া যে সন্তান নিজের নয়, অন্য কারোর।

* স্মৃতির সমস্যা

* অপরাধবোধে ভোগা বা নিজেকে খারাপ মা মনে হওয়া

* পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা পালাতে চাওয়া

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনও কখনও প্রসবোত্তর বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো প্রসবের পরপরই দেখা দিতে পারে আবার কখনো কখনো কয়েক মাস পরেও দেখা দিতে পারে।

কারো কারো ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো এক বা দু’দিনের জন্য হয়, কারো ক্ষেত্রে আবার লক্ষণগুলো ফিরে ফিরে আসতে পারে।

সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না দেওয়া হলে, লক্ষণগুলো আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে।
কারা প্রসবপরবর্তী বিষণ্ণতার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন?

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বয়স কম ও অল্প শিক্ষিত নারীদের প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় ভোগার সম্ভাবনা বেশি। বয়স, জাতি নির্বিশেষে যে-কোনো নব্য প্রসূতি মা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতায় পড়তে পারে।

তবে যাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে:

* পূর্ববর্তী বিষণ্ণতা বা অন্যান্য মানসিক ব্যাধির ইতিহাস

* বিষণ্ণতার পারিবারিক ইতিহাস

* গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা

* সাম্প্রতিক মানসিক চাপ, যেমন বিবাহবিচ্ছেদ, মৃত্যু বা প্রিয়জনের গুরুতর অসুস্থতা

* অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ

* যমজ, ট্রিপলেট বা অন্যান্য জটিলতা

* সময়ের আগে শিশুর জন্ম বা স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে জন্ম হওয়া

* একাকিত্ববোধ বা মানসিক সহযোগিতার অভাব

* ঘুমের সমস্যা এবং ক্লান্তি

প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা প্রতিরোধ করার উপায়
ডা. আরমানা ইসলাম বলছেন প্রসব পরবর্তী সময়কাল ৬ সপ্তাহ ধরা হয়। এর মধ্যে অনেকে বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন।

“যদি কারো মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয় তাহলে কাউন্সেলিং করতে হবে। সঙ্গে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ গুরুতর পর্যায়ে গেলে মা তার নিজের সন্তানকে বোঝা মনে করেন, এমনকি তাকে মেরেও ফেলতে চান। প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে,” বলেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা প্রসবোত্তর বিষণ্ণতাকে প্রতিরোধে নিচের এই চারটি উপায়ের কথা বলেন। সেক্ষেত্রে মাকে সচেতন হয়ে এই পদক্ষেপ গুলো নিতে হবে।

১. কথা বলুন
আপনি আপনার অনুভূতিগুলোকে নিজের মধ্যে না রেখে বিশ্বস্ত কারো সাথে ভাগাভাগি করে নিতে পারেন। তখন মনে হবে অন্যরা আপনার বিষয়গুলো শুনতে ইচ্ছুক এবং আপনি একা নন।

২. একা না থাকার চেষ্টা করুন
একা না থেকে বরং পছন্দের মানুষগুলোর সাথে বেশি বেশি সময় কাটান। এটি আপনার একাকিত্ব দুর করে অন্যদের সংস্পর্শে যেতে সাহায্য করতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের গ্রুপে যুক্ত হতে পারেন। একটি গ্রুপে থাকলে অন্যান্য বিষয়গুলোতে ফোকাস করতে হয় ফলে নিজের মানসিক চাপ এমনিতেই কিছুটা হালকা হয়ে যায়। নিজের বন্ধু- বান্ধবী কিংবা আত্মীয়স্বজনের সাথে বেশি সময় কাটান।

৩. নিজেকে জোর করে কাজে অন্তর্ভুক্ত করবেন না
আপনি যদি কাজ বা চাকরির জন্য প্রস্তুত না হন, তবে নিজের ওপর জোর করবেন না। মনে রাখবেন এই সময়টা আপনার এবং আপনার শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজনে আরো কিছুদিনের জন্য কাজ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।

৪. বিশ্রাম করুন এবং শান্ত থাকুন
মন ও শরীর উভয়কে ভালো রাখার জন্য রাতের ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার শিশু অনেকক্ষণ জেগে থাকে তাহলে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিন, যাতে আপনি পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন। আপনার শিশুর যত্নের জন্যই আপনার যথেষ্ট বিশ্রাম প্রয়োজন।
শিশুর সঙ্গে নতুন মায়েরও সমান যত্ন

ডা. আরমানা ইসলাম বলছেন বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশু জন্ম নেয়ার পর পরিবারের সবাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুটির যত্ন নেয়ার উপর জোর দেন।

তিনি বলেন শিশুর যত্ন নেয়ার অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে মায়ের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

“নরমাল ডেলিভারি হোক বা সি-সেকশন হোক না কেন, মায়ের যত্ন নিতে হবে। কারণ মনে রাখতে হবে মা কিন্তু একই সঙ্গে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। তাই তার (মায়ের) খাওয়া, ঘুম, বিশ্রামের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। কিন্তু এখানেই ঘাটতি দেখা যায়। দেখা যায় বাচ্চা নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কিন্তু মায়ের স্বাস্থ্য অগ্রাহ্য করার কোন অবকাশ নেই।”

আরও পড়ুন :হৃদ‌রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ইলিশ মাছ

জনপ্রিয়