শিরোনাম

বাড়িতে হাতি, হরিণ, কুমির ও ময়ুর পালবেন যেভাবে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : সোমবার, মার্চ ১৪, ২০২২ ৮:১৩:৩৫ অপরাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক
দেশের বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমতি নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের বাসিন্দারা কয়েক রকমের বন্যপ্রাণী পালন করতে পারেন।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, ”হাতি, হরিণ, কুমির আর ময়ূর, এই চারটি প্রাণী পালন করার জন্য আমরা অনুমতি দিয়ে থাকি। এর বাইরে আর কোন বন্যপ্রাণী খাঁচায় বা আটকে রেখে পালন করলে সেটা পুরোপুরি অবৈধ হবে।”

এর বাইরে অনুমতি নিয়ে পোষা পাখির খামার ও সাপের খামার তৈরির সুযোগ রয়েছে। পোষা পাখির মধ্যে ময়ূরের খামার তৈরির জন্যও উৎসাহিত করছেন কর্মকর্তারা। এসব প্রাণী বা পাখি লালন-পালন করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিধিমালা রয়েছে।

হাতি ও হরিণ পালনের নিয়মকানুন
বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে খামার আকারে হরিণ ও হাতি পালনের সুযোগ রয়েছে। ১০টি হরিণ বা একটি হাতি থাকলেই তাকে খামার হিসাবে গণ্য করা হবে।

শখের বসে অথবা জীবন্ত বিক্রির উদ্দেশ্যে হরিণ বা হাতি পালন করা যাবে। কিন্তু মাংস খাওয়া যাবে না বা বিক্রির উদ্দেশ্যে হরিণ জবাই করা যাবে না।

হরিণ ও হাতি লালন-পালন বিধিমালা-২০১৭ অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া হরিণ ও হাতি পালন করা হলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। সেজন্য এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এ ধরণের খামারের জন্য লাইসেন্স ফি ২০ হাজার টাকা, সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ১০ হাজার টাকা। প্রতিটি হরিণের জন্য পজেশন ফি এক হাজার টাকা দিতে হবে।

খামারে প্রতিটি হরিণের জন্য অন্তত ১০০ বর্গফুট আয়তন এবং ১০ ফুট উঁচু শেড থাকতে হবে। সেখানে দানাদার খাবার, খনিজ লবণ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। খামারের চারদিকে ১০ ফুট উঁচু নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকতে হবে।

যেসব বনে প্রাকৃতিকভাবে হরিণ পাওয়া যায়, সেখান থেকে এসব খামার অন্তত ৩০ কিলোমিটার দূরে হতে হবে।

যারা শখের বসে হরিণ লালন-পালন করবেন, সেই খামারে হরিণের সংখ্যা ১০টির বেশি হলে খামারি হিসাবে আবেদন করতে হবে।

হরিণ বা হাতির সংখ্যা বেড়ে গেলে, বিক্রি করার প্রয়োজন হলে বা পজেশন সার্টিফিকেট বাতিল হলে বন কর্মকর্তার লিখিত অনুমতিতে হরিণ বা হাতি বিক্রি, বিনিময় বা দান করতে পারবেন। তবে যার কাছে হরিণ হস্তান্তর করা হবে, তারও হরিণ পালনের লাইসেন্স বা অনুমতি থাকতে হবে।

বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলছেন, ”মাংস খাওয়া যাবে না অথবা মাংস, চামড়া বিক্রির জন্য হরিণ জবাই করতে পারবেন না। হরিণ মারা গেলেও সেটির চামড়া, মাথা বা হাড় কাউকে দিতে বা বিক্রি করতে পারবেন না। সেগুলো বন বিভাগে জমা দিতে হবে।”

হাতি বা হরিণ বাচ্চা দিলে, হরিণ বা হাতির মৃত্যু হলে ১৫ দিনের মধ্যে ভেটেরিনারি সার্জন কর্তৃক ইস্যুকৃত সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট বন বিভাগের দপ্তরকে অবহিত করবেন। হাতির বাচ্চা হলে ৯০ দিনের মধ্যে সেটির কানে ট্যাগ করে চিহ্নিত করতে হবে। এসবের ব্যত্যয় ঘটলে কারাদণ্ডসহ জরিমানার বিধান রয়েছে বিধিমালায়।

যেভাবে পালন করা যাবে কুমির
রফতানির শর্তে বাংলাদেশে কুমির পালন করার লাইসেন্স দিয়ে থাকে দেশটির বন বিভাগ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এর ধারা ৫২, ২৪ ধারা অনুযায়ী কুমির লালন-পালন বিধিমালা, ২০১৯ জারি করেছে সরকার। সেই অনুযায়ী, বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স নিয়ে কুমিরের খামার স্থাপন করা যায়।

খামার যেখানে স্থাপন করা হবে, সেই এলাকার বন কর্মকর্তার কাছ থেকে এই লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। খামার স্থাপনের জন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় লাইসেন্স ফি এক লাখ টাকা, সিটি কর্পোরেশনের বাইরের এলাকার জন্য ৫০ হাজার টাকা।

প্রতিটি কুমিরের জন্য মালিককে বাৎসরিক ভিত্তিতে পজেশন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিটি কুমিরের জন্য এক হাজার টাকা পজেশন ফি দিতে হবে। লালন-পালনের জন্য কুমির আমদানি করতে হবে, কোনভাবেই প্রকৃতি থেকে কুমির ধরা বা সংগ্রহ করা যাবে না।

তবে সেখানে শর্ত রয়েছে, কুমির লালন-পালন বা খামার স্থাপনে কমপক্ষে পাঁচ একর বন্যা মুক্ত জমি থাকতে হবে। এর দূরত্ব হবে সুন্দরবন থেকে অন্তত ১০০ কিলোমিটার। খামারে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

খামারে নিরাপদ অবকাঠামো, নিরাপত্তা বেষ্টনী, বর্জ্য পরিশোধন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, কুমিরজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতের জন্য সংরক্ষণাগার ইত্যাদি থাকতে হবে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি কুমিরের দেহে বন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে মাইক্রোচিপ লাগাতে হবে।

খামারের কুমির রপ্তানি যোগ্য হওয়ার পর দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে কুমির বা কুমিরজাত পণ্য সংগ্রহ করে রপ্তানি করার জন্য বন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে হবে।

খামারে কুমিরের হ্রাস-বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানির সব তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

ময়ূর ও পোষা পাখি পালন
বাংলাদেশে সরকারিভাবে ময়ূর বিলুপ্ত একটি পাখি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে ময়ূরসহ বিদেশি পোষা জাতের পাখি আমদানি করে লালন-পালন বা বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে।

পোষা পাখি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা- ২০২০ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকার বন কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে ময়ূরসহ এসব পাখির খামারও স্থাপন করা যায়। পোষা পাখির খামার স্থাপনের লাইসেন্স ফি খামারের জন্য ১০ হাজার টাকা।

তবে ময়না, টিয়া, ঘুঘুসহ সকল প্রকার দেশীয় পাখি আটকে রেখে পোষ মানানো, লালন-পালন করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।পোষা পাখির পায়ে রিং পড়াতে হবে। কোনভাবেই প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা যাবে না।

সাপের খামার স্থাপন করে রপ্তানির সুযোগ
বাংলাদেশে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সাপের খামার স্থাপন ও পরিচালনা করা যায়। তবে সেজন্য কিছু শর্ত রয়েছে।

একটি সাপের খামারের জন্য অন্তত দুই একর নিজস্ব জমি অথবা অন্তত ৩৩ বছরের জন্য ইজারাকৃত জমি থাকতে হবে। এই জমি হতে হবে বন্যা মুক্ত।

সরকারি যেকোনো বনাঞ্চলে থেকে খামারের অবস্থান হতে হবে অন্তত দুই কিলোমিটার দূরে। সেই সঙ্গে জনবসতি থেকে ৫০০ মিটার দূরে হতে হবে। কোন শিল্প কারখানার এক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে সাপের খামার থাকতে পারবে না। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সাপের খামার স্থাপনে লাইসেন্স ফি সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য এক লাখ টাকা, এর বাইরে ৫০ হাজার টাকা। সেখানে সকল অবকাঠামো পাকা ভবন হতে হবে। চারদিকে আট ফুট উঁচু ইটের প্রাচীর ও তিন ফুট উঁচু কাঁটা তারের বেড়া থাকতে হবে।

সাপের খামার পরিচালনায়, লালন-পালন, বিষ সংগ্রহের কাছে অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি, বন বা প্রাণিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি থাকতে হবে।

বিভিন্ন খামার, কৃষি জমি, জলাভূমি, পতিত জমি, গ্রামীণ বনাঞ্চল থেকে সাপ সংগ্রহ করতে হবে। সাপ সংগ্রহের আগে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানিয়ে স্থানীয় বন কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। সাপ সংগ্রহের পর তার কাছে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে। তবে বাংলাদেশের কোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে সাপ সংগ্রহ করা যাবে না।

প্রাথমিকভাবে ২০ টি সাপ দিয়ে খামার চালু করতে হবে। প্রজননকৃত প্রতিটি সাপের শরীরে বন বিভাগ থেকে সরবরাহ করা ট্যাগ স্থাপন করতে হবে।

খামারের সকল কার্যক্রম সিসি ক্যামেরায় তদারকি করতে হবে এবং অন্তত তিন মাসের ফুটেজ সংরক্ষণ করতে হবে। সাপের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি, কেনা-বেচা, আমদানি-রপ্তানির যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সাপের বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। সকল তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। বিষ বা সাপের চামড়া রপ্তানি করতে হলে বিআইটিএসে সার্টিফিকেটসহ বন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে হবে।

বন্যপ্রাণী রক্ষায় কী করছে বন বিভাগ
তবে যেসব বন্যপ্রাণী বৈধভাবে লালন-পালনের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ, এর বাইরেও অনেক সময় অনেক বন্যপ্রাণী খাঁচায় আটকে পালন করতে দেখা যায়।

সবচেয়ে বেশি বানর আটকে রেখে খেলা দেখানোর কাজ ব্যবহার করতে দেখা যায়।এছাড়াও বিভিন্ন মিনি চিড়িয়াখানায় অজগর, সজারু, বিভিন্ন পাখি, বনবিড়াল, উদবিড়াল, ভোঁদড় ইত্যাদি আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে।

বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”যেগুলোকে আমরা অনুমতি দিয়েছি, সেগুলো ছাড়া আর সব বন্যপ্রাণী আটকে রাখা বা পালন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।এজন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান আছে।”

”আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। যেকোনো তথ্য পেলেই সেখানে অভিযান চালানো হয়। আমরা চেষ্টা করি যেন শতভাগ ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হয়।”

তিনি জানান, তারা গত দুই তিন বছরে তারা ৪০ হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছেন। এসব অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩০০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন : চারশ বছর পর খুঁজে পাওয়া গেল হারিয়ে যাওয়া মহাদেশ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়