বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ফোনে আড়িপাতা

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২৩ ১১:০৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ

মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমে আইনসম্মতভাবে নজরদারি বা আড়িপাতার জন্য বাংলাদেশে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।

মোবাইল ও সামাজিক মাধ্যমে আড়িপাতার ইসরায়েলি আধুনিক সরঞ্জাম কিনেছে, এমন খবর আলোচনার মধ্যেই এই তথ্য জানালো সরকার।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঘটনায় মোবাইলের কথোপকথন ফাঁস হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও।

দেশটির রাজনৈতিক ও অ্যাকটিভিস্টরা বলছেন, এভাবে আড়িপাতার কারণে তাদের মধ্যে উদ্বেগ এবং বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিরোধী রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন, বিরোধীদের দমন করার যন্ত্র আড়িপাতার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে সরকার।

আড়িপাতা নিয়ে কী বলছে সরকার?
জাতীয় সংসদে গত ১২ই জানুয়ারি ২০২৩ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধে ‘আইনসম্মতভাবে’ আড়িপাতার ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘’ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশ ও সরকার বিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধে এনটিএমসিতে (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স টেকনোলজির মতো আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজিত হয়েছে। একই সঙ্গে একটি ইন্টিগ্রেটেড ল’ফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেম (আইনসম্মতভাবে মোবাইল ও ইন্টারনেট মাধ্যমে আড়িপাতার ব্যবস্থা) চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।‘’

এমন সময় সংসদে এসব কথা বললেন স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ইসরায়েলের সংবাদপত্র হারেৎজ-এ প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকার পরও বাংলাদেশের কাছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রি করা হয়েছে।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে, আধা কিলোমিটার পরিধিতে থাকা সব ডিভাইসে হোয়াটসঅ্যাপের এনক্রিপ্টেড বার্তা, ফেসবুকের চ্যাট, কন্টাক্ট লিস্ট, কল এবং বার্তায় প্রবেশ করা যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুদিন আগে আনুষ্ঠানিক এই স্বীকারোক্তি দিলেও বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহুদিন ধরেই এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু মোবাইল নয়, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও এসব সংস্থা নজরদারি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে ২০২১ সালে, কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরায় এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসরায়েল থেকে একই ধরনের নজরদারী প্রযুক্তি কেনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়।

ভয়েস অব আমেরিকাকে ২০২১ সালের অগাস্টে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে এনটিএমসির প্রধান, মেজর জেনারেল (তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, তার প্রতিষ্ঠান দেশের স্বার্থে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা করছে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে।

‘’এনটিএমসি মূলত একটি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক নির্দেশিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অপারেশনাল কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য এনটিএমসি থেকে কারিগরি সহায়তা নিয়ে থাকে। প্রত্যেক সংস্থাই আলাদা আলাদাভাবে এই সহায়তা নিয়ে থাকে। এখানে, কোন সংস্থা কার ফোন রেকর্ড করছে এনটিএমসির জানার কোনও সুযোগ নেই।‘’ ভয়েস অব আমেরিকাতে তিনি বলেছিলেন।

এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার টেলিফোন আলাপ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফোনালাপ, বিএনপির প্রয়াত নেতা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মওদুদ আহমেদ ও রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার নাজমুল হাসানের ফোনালাপ, হেফাজতে ইসলামীর নেতা মামুনুল হক , বিএনপি নেতা তারেক রহমান ও শমসের মবিন চৌধুরীর, মাহী বি চৌধুরী ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ফোনালাপ ফাঁস।

রিটকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেছিলেন, ‘’রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় করো ফোনালাপে রেকর্ড করায় আপত্তি নেই। কিন্তু এর বাইরে যেকোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত ফোনালাপ রেকর্ড ও ফাঁস করার আইনগত অধিকার কারও নেই। আমাদের বক্তব্য এখানেই।‘’ যদিও পরে হাইকোর্ট ওই রিটটি খারিজ করে দেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকের একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পরে নুরুল হকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। সেই ঘটনায় নুরুল হক বলেছিলেন, “আমরা যেহেতু অপজিশনের জায়গা থেকে রাজনীতি করি তাই আমার কাছে একাধিকবার মনে হয়েছে যে আমার ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। কারণ আমার কিছু ব্যক্তিগত আলাপ-আমি বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি যে এগুলোর তথ্য বাইরে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। এটাতো সাধারণ মানুষের কাজ না।”

বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা এবং অন্য আরেক ব্যক্তির সাথে মাহমুদুর রহমান মান্নার একটি কথিত টেলিফোন আলাপ ২০১৬ সালে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পরার পর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এক বছর আট মাস কারাগারে থাকার পর রাষ্ট্রদ্রোহ এবং সেনা বিদ্রোহে উস্কানি দেবার মামলায় তিনি জামিন পান।

সর্বশেষ একজন চিত্রনায়িকার সঙ্গে অশালীন আলাপের অডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পর স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে মোহাম্মদ মুরাদ হাসানকে পদত্যাগ করতে হয়।

এসব টেলিফোন আলাপ রেকর্ড বা ফাঁসের ঘটনায় অবশ্য কখনোই সরকারি তরফ থেকে দায়দায়িত্ব স্বীকার করা হয়নি। বরং একাধিক ঘটনায় ফোনালাপ ফাঁসের তদন্ত করার কথা জানিয়েছে সরকারি সংস্থাগুলো।

কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিকদের অভিযোগ, এ ধরনের রেকর্ড ও ফাঁস করার মতো সক্ষমতা সরকারি সংস্থাগুলো ছাড়া অন্য কারও নেই।

দেশের টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ অনুযায়ী আড়িপাতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে ২০০৬ সালের সংশোধনে ৯৭ ধারায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টেলিফোন আলাপ ও বার্তা রেকর্ড করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন ও সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলছেন, ‘’খুব সাদামাটা বাংলায় বলা যায়, এটা হচ্ছে পুরোপুরি রাইট টু প্রাইভেসি লঙ্ঘন। যদিও বাংলাদেশে আড়িপাতাকে বিভিন্নভাবে জাস্টিফাই করা হয়। কিন্তু এর আগে যেসব ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, তা পুরোপুরি রাইট টু প্রাইভেসির লঙ্ঘন। যদিও বাংলাদেশে এই গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকে মৌলিক অধিকার হিসাবে এখনো দেখা হয় না।‘’

তিনি বলছেন, ‘’এ পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা দেখেছি, আড়িপাতার ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত অনেক অপব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে।‘’

সরকার নতুন যে আইন করার কথা বলছে, সেই প্রসঙ্গে অধ্যাপক ফারজানা রহমান বলছেন, ‘’সরকার যদি চিন্তা করে যে, আইন করবে, আড়িপাতার নতুন যন্ত্র আনবে, সেটার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারের। এটা যদি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। ফলে এটার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।‘’

তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, এ ধরনের আইন করতে হলে সিভিল সোসাইটির সঙ্গে মত বিনিময় করে সেটি করতে হবে। সেই সঙ্গে এর যেন অপপ্রয়োগ বা অপব্যবহার করা না হয়, সেই জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে।

জনপ্রিয়