শিরোনাম

বিপদ কেটেছে মোংলার: ঘূর্ণিঝড় ফনী’র আতঙ্কে নির্ঘূম রাত কেটেছে উপকুলবাসীর

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, মে ৪, ২০১৯ ৯:০৪:৪৭ অপরাহ্ণ
Mongla
ছবি : মাসুদ রান

মাসুদ রানা, মোংলা প্রতিনিধি:
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্নিঝড়টি বিপদ সংকেতে পরিণত হওযায় মোংলাসহ সুন্দরবন উপকূলবাসীর মাঝে আতঙ্ক ছড়িযে পড়ে। লাগাতার গুড়িগুড়ি বার্ষণ ও স্বাভাবিকের তুলনায় জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওযায় উপকুলের ওয়াপদা ও বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার ভয়ে বড় ধরনের ঘূর্নিঝড়ের আশংকায় উপকুলের লক্ষ লক্ষ মানুষের নির্ঘূম রাত কেটেছে। অপরদিকে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা তাদের নৌকা ও ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে নিরাপদে এবং এলাকায় ফিরে এসেছে।

শনিবার ভোর রাত থেকে বাতাস আর বর্ষনের সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকার নিম্নাঞ্চলের মানুষ আতংকিত হয়। এছাড়া জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষের মাঝে নতুন করে ভীতি সৃষ্টি করে। শনিবার রাতে উপকূলীয় এলাকার কয়েক লক্ষ মানুষ ভয়াবহ ঘূর্নিঝড়ের আশংকায় রাত জেগেছিল। এদিকে ঘুর্নিঝড়ের সাত নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে মোংলা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে এ ঘোষণা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। একইসঙ্গে বিশেষ সতর্কতা এলার্ট-৩ পরিবর্তন করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের সংকেত এলার্ট-১ জারি করেছে। তবে আবহাওয়া অফিস সাত নম্বর বিপদ সংকেত থেকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করায় কিছুটা নিশ্চিচিন্ত হয়েছে এলাকার মানুষ।

উপকুলীয় এলাকা সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলার জয়মনি গ্রামের আলতাফ মিয়া ও ছলেমান জানান, সিডর, আইলায় ও মহসেনের বিধ্বস্থ এলাকার মানুষ আকাশ গুমোট দেখলেই আতঙ্কে পড়ে। এরমধ্যে এবছর রেকর্ড ছাড়িয়ে ঘুর্নিঝড়ের নাম ও পশুর নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যেন জীবনের অন্য সময়ের ভয়কেও হার মানিয়েছে। চিলার ইউনিয়নের জয়মনি এলাকার মিনাজ ব্যাপারী জানান,বয়েসে এত নদীর পানি বৃদ্ধি আর কখনও দেখিনি। এই উপকুলের মানুষ বার বার ক্ষতিগ্রস্থের শিকার হয়েও এক অজানা আতঙ্কে ভুগতে থাকে। আমাদের এই এলাকা কোন ক্রমেই রক্ষা করা দুরুহ হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সাগর থেকে ফিরে আসা ফিশিং ট্রলারের মাঝি শাখাওয়াত হোসেন জানান, গত ৩ দিন ধরে সাগরে প্রচন্ড ঢেউয়ের কারণে জাল পাতা সম্ভাব হয়নি।

সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় জীব যন্তু গুলো বড় বড় গাছের মুথায় ও টিলায় আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। শত শত মাছ ধরা ট্রলারগুলো লোকালয়ে ফিরে এসেছে। এবার এই ভয়াবহ পানি বৃদ্ধি ও বর্ষনের কারণে সকলের মাঝেই একটি নতুন করে ঘূর্নিঝড়ের আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। যার নাম ‘ফনি’। উপকূলীয় এলাকার মোংলা পশুর নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষগুলো আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছে কখন যানি আঘাতহানে নুতান ঘূর্নিঝড় ফনি।

তবে আবহাওয়া অফিসের বড়ধরনের কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগের বিপদ সংকেত না থাকার পরও অজানা ভীতি কাজ করেছিল তাদের মাঝে। শনিবার ভোরে মোংলা উপজেলায় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণী আঘাত হানে। এসময় ফণীর তান্ডবে উপজেলার চিলা, কানাইনগর, বৌদ্ধমারী ও জয়মনি এলাকায় ঝড়ের আঘাতে ভেঙে যায় বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালা। সকালের দিকে ঝড়ের তান্ডবে ভেঙে যায় কানাইনগরের বেড়িবাঁধ। ভেঙে পড়া ঘরবাড়ির বাসিন্দারা রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকায় হতাহতের হাত থেকে বেঁচে গেছে। ফণীর তান্ডবে এ এলাকার নদীপাড়ের কানাইনগরের ছয় হাজার ফুটের বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এ অবস্থায় নদীর পানি ঢুকে পড়লে কয়েক’শ পরিবার তলিয়ে যেতো। এ ব্যাপারে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ নাহিদুজ্জামান বলেন,বাঁধটি ভেঙে পড়ার খবর শুনেছি। ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে টিআর কাবিখা দিয়ে মাটির কাজ করে বাঁধটি সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু নদীর পানির চাপ, উচ্চতা এবং ঝড়ের প্রভাবে বাঁধটি আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না, এটি এখন স্থায়ীত্ব করতে পাকা অবকাঠামোর প্রয়োজন।

পরিবেশ বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার জানান, শুক্রবার বিকাল থেকে তিনি নিজে গিয়ে উপকুলীয় এলাকার লোকজনকে আশ্রায় কেন্দ্রে জাওয়ার জন্য তাগিত দেয়া হয়েছে এবং সিপিপি সেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় লোকজন আশ্রায় কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রায় নিয়েছে। এদিন সন্ধ্যায় তাদের মাঝে উপজেলা প্রশাসন থেকে শুকনা খাবার ও প্রতিটি আশ্রায় কেন্দ্রে দুপুরে খিশুরী খাবার দেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘুর্নিঝড়ে বড় ধরনের কোন ক্ষক্ষতি হয়নী বরেও জানান উপমন্ত্রী। পৌর মেয়র আলহাজ্ব মোঃ জুলফিকার আলী জানান, পৌর এলাকার আশ্রায় নেয়া লোকজনকে রাতে শুকনা খাবার, সকালের নাস্তা এবং দুপুরে খিশুরী খাওয়ানোর ব্যাবস্থা করা হয়েছে পৌরসভার পক্ষ থেকে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার দুরুল হুদা জানান, বিপদ সংকেত পরিবর্তনের পর বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শনিবার দুপুরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে বন্দরের অপারেশনাল এবং জাহাজে পণ্য খালাস ও বোঝাইয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরইমধ্যে বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের (শিপিং এজেন্ট, স্টিটিভিডর অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন মালিক গ্রুপ ও লাইটারেজ এসোসিয়েশন) নোটিশ টু মেরিনার (এনটিএম) মেইলযোগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বন্দরে অবস্থানরত দেশি-বিদেশি ১৬টি বাণিজ্যিক জাহাজে পণ্য খালাস ও বোঝাইয়ের কাজ চালু করতে ব্যাবস্থা নেয়া হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ এসব জাহাজে কাজ শুরু হবে এবং রোববার ৩টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করবে আর নতুন করে ২টি জাহাজ আসবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন : ‘ফণী’র তাণ্ডবে উড়ে গেল এভারেস্টের ২০ তাবু

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়