বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে যা বলছে কর্তৃপক্ষ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২২ ১১:৪৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক:
সম্প্রতি বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রায় ৪০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি ঘোষণা করেছে।

এর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ইস্ট ওয়েস্ট, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এআইইউবি, ড্যাফোডিলের মতো বড় এবং নামী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রয়েছে।

এছাড়া ৩রা সেপ্টেম্বর সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সম্মেলনও করেছে সংগঠনটি।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই সেখানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ ছিল। যে কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠন নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই নানা আলোচনা চলছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ নিয়ে পৃথকভাবে তাদের মতামত এবং প্রতিক্রিয়াও জানাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনায় থাকা কর্তৃপক্ষ বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেছেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু আমরা একে সব সময় নিরুৎসাহিত করে এসেছি।”

তিনি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মত নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করেছে।

তিনি বলেন, “আমরা (ছাত্র রাজনীতি) করতে বারণ করি এবং দিই না করতে। সেটা কোন আইনের মাধ্যমে না। আমরা ছাত্র ভর্তি হওয়ার সময় তাদেরকে বলি যে এটা অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র রাজনীতি এখানে করা যাবে না।”

তিনি মনে করেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির কারণে নানা ধরণের মারামারি বা সংঘাত হয়, সেটা তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে দিতে চান না।

ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকার প্রসঙ্গে মি. হোসেন বলেছেন, “তাদের অধিকার থাকতে পারে, তারা করুক। কিন্তু আমাদের প্রেমিসেসের (আঙ্গিনা) মধ্যে না করার কথা বলছি আমরা।”

এখন ছাত্রলীগের কমিটি গঠন সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এক্ষেত্রে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আলাদা করে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে এবং শিক্ষার্থীদের জানাবে। এই বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সহকারী অধ্যাপক রুবানা আহমেদ এক ইমেইলে জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের ই-মেইল করে তাদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

শিক্ষার্থীদের ই-মেইলে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ একটি প্রতিষ্ঠান এবং কোন রাজনৈতিক ক্লাব বা সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যদের, নিজেদের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কোন ক্লাব বা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া কিংবা সংগঠন করতে পারার স্বাধীনতা আছে।”

রুবানা আহমেদ আরো বলেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনও সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিংবা প্রচারণামূলক কাজে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লোগো ব্যবহার করা যাবে না।”

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রায় একই ধরণের বক্তব্য দিয়েছে এআইইউবি। রোববার নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘জরুরি ঘোষণা’ শিরোনামে একটি পোষ্ট দিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, এআইইউবি একটি অরাজনৈতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের এআইইউবির ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

‘কোড অব কন্ডাক্ট’ হিসেবে ওই পোস্টে তিনটি বিষয় উল্লেখ করা হয়,”বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোন রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়া বা কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া নিষিদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনও ধরনের সংগঠন প্রতিষ্ঠার আগে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বা বাইরে বিনা অনুমতিতে এআইইউবির নাম, লোগো বা স্বাক্ষর ব্যবহার করে কোন কার্যক্রম বা কর্মসূচি করা নিষিদ্ধ।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ‘কোড অব কন্ডাক্টে’র ব্যত্যয়কে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার ফল হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থগিতাদেশ বা বহিষ্কার করা হতে পারে বলেও নোটিসে সতর্ক করা হয়েছে।

একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মনীতির ‘লঙ্ঘন’ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

এছাড়া ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে কোন রাজনৈতিক ক্লাব বা সংগঠনকে সমর্থন করে না বলে শিক্ষার্থীদের জানিয়েছে। তবে এই দুইটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এতদিন কী ব্যবস্থা চালু ছিল?
বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলেও, গত ৩০ বছরে কোন ক্যাম্পাসেই কোন ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের করা ১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, এবং ২০১০ সালের সংস্কার করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে।

এই দুইটি আইনের কোনটিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা উল্লেখ নেই। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধনের সময় ট্রাস্টিদের রাজনৈতিক পক্ষপাতহীনতার কথা উল্লেখ করতে হয়, এবং সে শর্ত মেনেই ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়।তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবারই প্রথম কোন ছাত্র সংগঠন কর্মকাণ্ড শুরু করেছে বিষয়টি এমন নয়।

এর আগে ২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপ করা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবীতে হওয়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিষেধাজ্ঞার কারণে সেসময় তাদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড চালাতে দেখা যায়নি।আবার ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও একই পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।

মহামারির মধ্যে ২০২০ সালেও টিউশন ফি কমানোর দাবিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল।
ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা

এসব আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কোন দলের ব্যানারে তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে দেখা যায়নি।

এসব ঘটনার উল্লেখ করে শেখ কবির হোসেন বলেছেন, “আমরা তখনো ছাত্রদের নিরুৎসাহিত করেছি, এখনো তাই-ই বলবো। আমার মনে হয় এটা ঠিক হবে না।”

কর্তৃপক্ষের আপত্তির ব্যাপারে ছাত্রলীগ কী বলছে?
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সংগঠনের কর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে কমিটি দেয়ার কাজটি বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে।

তবে এবারে তারা একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি দিয়ে সংখ্যাটি প্রায় ৪০টির কাছাকাছি নিয়ে গেছে, আর সে কারণেই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সম্পাদক আল-আমিন রহমান বলেছেন, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, আর সেজন্যই তারা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।

তবে ঠিক এই সময়েই কেন ঘটা করে এতগুলো কমিটি গঠন করা হলো এবং একটি সমন্বিত সম্মেলন করা হলো সে বিষয়ে পরিষ্কার জবাব পাওয়া যায়নি ছাত্রলীগ নেতৃত্বের কাছ থেকে।

কর্তৃপক্ষের আপত্তির বিষয়ে রহমান বলেছেন, “বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আমাদের কমিটি আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে কর্তৃপক্ষ রাজনীতি অনুমোদন করেন না, কিন্তু আমরা মনে করি ছাত্র সংগঠন হিসেবে সেখানে ছাত্রলীগের কর্মীরা আছে, তারা রাজনীতি করবে, করুক।”

“কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি মনে করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কেউ কার্যক্রম করতে পারবে না, সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আমরা আমাদের কার্যক্রম চালাবো,” বলেন রহমান। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

আরও পড়ুন : সব দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ চান সিইসি

জনপ্রিয়