ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক আর নেই

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২২ ১২:১৫:২৪ অপরাহ্ণ

চলমান বার্তা ডেস্ক
বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও ভাষাসৈনিক খান জিয়াউল হক আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মাগুরা শহরের জামে মসজিদ রোডের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। কিছুদিন যাবত তিনি অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

মাগুরার বিশিষ্ট এ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভাষাসৈনিক শিক্ষক খান জিয়াউল হকের মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, খান জিয়াউল হক দীর্ঘদিন যাবত শহরের জামে মসজিদ রোডের নিজ বাড়ি মুসফেকা প্যালেসে পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে বসবাস করতেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় বার্ধক্যজনিত কারণে সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ৫ ছেলে ১ মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। গত ১ আগস্ট তাঁর স্ত্রী মারা যান।

খান জিয়াউল হকের জন্ম ১৯২৮ সালের ৮ জুন মাগুরার ভায়না গ্রামে। তার বাবা আবুল কাশেম খান ছিলেন তৎকালীন মাগুরা এসডিও কোর্টের নাজির। ৯৫ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে বাবার চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করে যশোর জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, কলকাতা রিপন কলেজে এবং যশোর এমএম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ পড়েছেন।

এমএম কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি পর্যায়ক্রমে ছাত্র সংসদের জিএস ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এসময় তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫২ সালে যশোর এমএম কলেজে ব্যাপক পুলিশি হামলার পর তিনি মাগুরায় চলে আসেন এবং ভাষা আন্দোলনে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে মাগুরায় মিছিল বের হলে মিছিল থেকে পুলিশ খান জিয়াউল হককে আটক করে।

খান জিয়াউল হক শিক্ষাজীবন শেষে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন। পরে মাগুরা মডেল হাইস্কুলে যোগ দিয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে মাগুরা এজি একাডেমি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৪৪ বছর তিনি সেখানেই দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন।

জীবনের বৃহৎ অংশ তিনি ব্যয় করেছেন শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। জেলার অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় ও অগ্রযাত্রায় তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান। জাতীয় পর্যায়ে তিনি পেয়েছেন বেশ কিছু সম্মাননা ও স্বীকৃতি।

কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বাংলাদেশ স্কাউটসের সর্বোচ্চ সম্মান রৌপ্য ব্যাঘ্র, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় সমাজকল্যাণ পুরস্কার, আবৃত্তিতে অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ প্রবর্তিত ‘গোলাম মুস্তাফা আবৃত্তি পদক’ এবং কণ্ঠশীলন প্রবর্তিত ‘নরেণ বিশ্বাস পদক’ প্রদান করা হয়। এছাড়াও শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পুরস্কার, আব্দুল হাই গোল্ড মেডেল, হরিশ দত্ত নাট্য পদক, থিয়েটার ইউনিট নাট্য পদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমি পদকসহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন খান জিয়াউল হক।

মাগুরার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ খান জিয়াউল হকের মৃত্যুতে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর, মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. বিরেন শিকদার, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল ফাত্তাহ, সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুণ্ডু, সদর উপজেল পরিষদ চেয়ারম্যান আবু নাসির বাবলু, পৌর মেয়র খুরশীদ হায়দার টুটুল, মাগুরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান হাবিব কিশোর, হাসান ইমাম সুজা, জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক সেলিনা হাসান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাশেদ মাহমুদ শাহিন, মাগুরা এজি একাডেমি বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট শাখারুল ইসলাম শাকিলসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন মাগুরা টাউন হল ক্লাব, আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠবীথি, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, রোটারি ক্লাব শোক প্রকাশ করেছেন। আজ শনিবার দুপুর ২টায় মাগুরা শহরের নোমানী ময়দানে মরহুমের জানাজা শেষে ভায়না পৌর কবরস্থানে দাফন করা হবে।

জনপ্রিয়