মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (২য় পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : সোমবার, মে ১৩, ২০১৯ ১০:০৪:০৫ অপরাহ্ণ
Mohmmed S.
নবী সা. এর রওজা মোবারক। ছবি : সংগৃহীত।

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে চলমান বার্তার সম্মানিত পাঠকদের জন্য মহানবী সা. এর জীবনী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকে রয়েছে নবীজী স.  উদ্যোগ নিয়েছে। আজকে থাকছে নবী সা. এর বাল্য জীবন ও বৈবাহিক জীবন।

বাল্যজীবন: মহানবীর প্রথম দুধ-মা হন সুয়াইবাহ নামক এক মহিলা। পরে হালীমাহ আস সাদীয়াহ শিশু মোহাম্মদ সা. কে নিয়ে আসেন চির স্বাধীন মরু বেদুইনদের মাঝে। ছয় বছর বয়সে ফিরে আসেন মায়ের কাছে। মা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরব যান। স্বামীর কবর দেখা ও আত্মীয় বাড়ীতে প্রায় মাস খানেক থাকার পর আমিনা পুত্রকে নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হন। আবওয়া নামক স্থানে মা আমিনা মৃত্যুবরণ করেন।

দাসী উম্মু আইমান মোহাম্মদ স. কে মক্কায় নিয়ে আসেন। দাদা আবদুল মুত্তালিবের স্নেহ ছায়ায় মোহাম্মদ সা. পালিত হতে থাকেন। নবীজির বয়স যখন আট বছর তখন দাদা আবদুল মুত্তালিবও মারা যান। এবার চাচা আবু তালিব মোহাম্মদ স. লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় আযইয়াদ উপত্যাকায় মুক্ত আকাশের নীচে মোহাম্মদ সা. মেষ চরাতেন। বারো বছর বয়সে মোহাম্মদ সা. চাচা আবু তালিবের সংগে সিরিয়া সফর করেন।

হিলফুল ফুজুল:
যুদ্ধ ছিলো আরবদের নেশা। শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলো। মানুষের কোন নিরাপত্তা ছিলো না। সবাই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতো। আয যুবাইর ইবনু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন একজন কল্যাণকামী ব্যক্তি। তিনি এই অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে মত বিনিময় করেন। অনুকুল সাড়াও পেলেন। গড়ে উঠলো একটি সংগঠন। নাম তার হিলফুল ফুজুল। মহানবীর বয়স তখন সতের বছর। তিনি সানন্দে এই সংগঠনের অন্তর্ভূক্ত হন।

হিলফুল ফুজুলের পাঁচ দফা:
১। দেশ থেকে অশান্তি দূর করা।
২। পথিকের জান-মালের হেফাজাত করা।
৩। অভাবগ্রস্থদের সাহায্য করা।
৪। মাযলুমের সাহায্য করা।
৫। কোন জালিমকে মক্কায় আশ্রয় না দেয়া।

হাজরে আসওয়াদ বিরোধ মীমসাংসা:
পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত কা’বা। একবার পাহাড়ের পানি তোড়ে এর দেয়াল ভেঙ্গে যায়। কুরাইশরা নতুনভাবে কা’বার দেয়াল গড়ে তোলেন । নির্মাণকালে হাজরে আসওয়াদ কা’বার কোণ থেকে সরিয়ে রাখা হয়। দেয়াল নির্মাণের পর পাথরটি আবার যথাস্থানে বসানো নিয়ে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। কুরাইশদের সব খান্দান এই মহান কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলো। ফলে শুরু হয় বিবাদ, যুদ্ধ বেঁধে যাবার উপক্রম দেখা দেয়। এঅবস্থায় আবু উমাইয়াহ ইবনুল মুগীরাহ প্রস্তাব দেন যে, যে ব্যক্তি আগামীকল্য প্রভাতে সবার আগে কা’বা প্রাঙ্গণে পৌঁছিবে তার উপর এই বিরোধ মীমাংসার ভার দেয়া হবে। সে যেই সিদ্ধান্ত দিবেন তা সবাই মেনে নিবেন। সকলেই তার এই প্রস্তাব মেনে নেয়।

অত:পর দেখা গেল প্রভাতকালে সবার আগে ধীর পদে এগিয়ে আসছেন যুবক মোহাম্মদ স.। সবাই ছুঁটে এলো তাঁর কাছে। ফায়সালার দায়িত্ব দেয়া হলো তাঁকে। দায়িত্ব পেয়ে তিনি উপস্থিতিদের একটি চাদর আনার নির্দেশ দেন। চাদর আনা হলে মোহাম্মদ স. নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ তুলে চাদরের মাঝখানে রাখলেন। অত:পর প্রত্যেক খান্দানের একজন করে প্রতিনিধিকে চাদর ধরে উপরে তুলতে বললেন। সকলে মিলে পাথরটি নিয়ে এলো কা’বার দেয়ালের কাছে। মোহাম্মদ স. চাদর থেকে পাথরটি তুলে যথাস্থানে বসিয়ে দিলেন। তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন নবীর দুরদর্শিতায় সবাই খুশি হলেন এবং সেই সাথে এড়ানো গেলো একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

যৌবনকাল: ব্যবসায়ী মোহাম্মদ স.:
মোহাম্মদ স. এর চাচা আবু তালিব একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। কিশোর মোহাম্মদ স. মাত্র ১২ বৎসর বয়সে চাচার সাথে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া সফর করেন। যৌবনে তিনি নিজে ব্যবসা শুরু করেন। লোকেরা তাঁর সততায় মুগ্ধ ছিলো। অনেকেই মূলধন দিয়ে তাঁর সাথে ব্যবসায় শরীক হতে লাগলো। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন ও ইয়েমেন গমণ করেন। ওয়াদা পালন, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে তিনি একজন বিশিষ্ট শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন। সকলে তাঁকে নতুন নাম আল-আমিন (বিশ্বাসী) নামে ডাকতে শুরু করে। খাদিজা ছিলেন একজন অন্যতম ধনাঢ্য মহিলা। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়। কিন্তু দ্বিতীয় স্বামীও মারা যান। খাদীজা রা. যেমনি ধনশালী ছিলেন তেমনি ছিলেন সচ্চরিত্রা। এই পবিত্র মহিলাকে লোকেরা আত তাহিরাহ বলে ডাকতো। বিধবা খাদিজা রা. পুঁজি দিয়ে লোকদের দ্বারা ব্যবসা চালাতেন। মোহাম্মাদ সা. এর ব্যবসায়িক যোগ্যতা ও সততার কথা তাঁর কানে গেলো। প্রথমে নবী করীম স. মুদারিব বা উদ্যোক্তা (তিনি স্বীয় মেধা ও যোগ্যতাবলে ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবেন) এবং অন্যপক্ষ খাদিজা রা. সাহিবুল মাল বা রাব্বুল মাল (অর্থাৎ ব্যবসায় প্রয়োজনীয় অর্থ বিনিয়োগ করবেন) এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসা শুরু করেন। উভয়েরই লাভ-লোকসানের নির্দিষ্ট হিস্যার পরিমাণ চুক্তিতে উল্লেখ ছিল। ব্যবসা শুরুর পর খাদিজা রা. মোহাম্মাদ সা. ব্যবসায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্মাধ্যক্ষ নিযুক্ত করার প্রস্তাব দেন। মোহাম্মাদ সা. এই প্রস্তাব গ্রহণপূর্বক দক্ষতার দায়িত্ব পালন করেন। বাণিজ্য উপলক্ষে তিনি বেশ কয়েকবার সিরিয়া যান এবং প্রচুর মুনাফা উপার্জন করেন।

ছিনাচাক: হুজুর পাক সা. এর মোট চারবার ছিনাচাক করা হয়। ১ম বার চার বছর বয়সে, ২য় বার দশ বছর বয়সে, ৩য় বার ওহী নাজিলের পূর্বে এবং ৪র্থ বার মেরাজ গমণের পূর্ব মুহুর্তে।

বৈবাহিক বিবরণ:
নবীজির বয়স যখন ২৫ তখন প্রথম বিয়ে করেন ৪০ বছর বয়স্কা বিবি খাদিজা রা. কে। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি আল্লাহ্র নির্দেশে আরো ১২টি বিবাহ করেন। তবে ১ম স্ত্রীর জীবদ্দশায় অন্য স্ত্রী গ্রহণ করেন নাই। ৬৫ বৎসর বয়সে খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন। ‘জান্নাতুল মাওয়ায়’ তাঁকে দাফন করা হয়।
২য় স্ত্রী: সাওদা রা. কে নবুওতের দশম বর্ষে বিয়ে করেন। এসময় উভয়েরই বয়স ছিল ৫০ বছর। দাম্পত্যজীবন ছিল ১৪ বছর। হিজরী ১৯ সালে সাওদা রা. মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
৩য় স্ত্রী: আয়েশা রা. কে নবুওতের একাদশ বর্ষে নবীজি ৩য় বিয়ে করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ৫৪ বছর আর স্ত্রী আয়েশা (রা.) এর বয়স ছিল নয় বছর। ৫৮ হিজরীর ১৭ রমজান আয়েশা (রা.) ইন্তেকাল করেন।
৪র্থ স্ত্রী: হাফসা রা. ওমর রা. এর বিধবা কন্যা ২২ বছর বয়সী হাফসা রা. কে বিয়ে করেন হিজরী তিন সালের শাবান মাসে। এসময় নবীজির বয়স ছিল ৫৫ বছর। হাফসা রা. হিজরী ৪১ সালের জমাদিউল আওয়াল মাসে মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
৫ম স্ত্রী: ৩০ বছর বয়সী যয়নব রা. কে বিয়ে করেন হিজরী তিন সালে। মাত্র তিন মাস দাম্পত্যজীবন যাপনের পর যয়নব রা. ইন্তেকাল করেন।
৬ষ্ঠ স্ত্রী: উম্মে সালমা রা. এর বয়স ২৬ বছর, নবীর বয়স ৫৬ বছর। হিজরী ৪ সালে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। হিজরী ৬০ সালে উম্মে সালমা রা. ইন্তেকাল করেন।
৭ম স্ত্রী: যয়নব বিনতে জাহ্্শ রা.। হিজরী ৫ সালে ৩৭ বছর বয়স্কা যয়নব রা. বিয়ের করেন ৫৭ বছর বয়স্ক আমার প্রিয় নবী। যয়নব রা. ২০ হিজরীতে মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
৮ম স্ত্রী: জুয়াইবিরয়্যা রা.। বয়স ২০ বছর, নবীর বয়স ৫৭ বছর। হিজরী ৫ সালের শাবান মাসে। স্ত্রী মারা যান হিজরী ২০ সালে মদীনায়।
৯ম স্ত্রী: উম্মে হাবীবা রা.। ৩৬ বছর বয়সী উম্মে হাবীবা রা. ৫৮ বছর বয়সে বিয়ে করেন হিজরী ৬ সালে। হিজরী ৪৪ সালে উম্মে হাবীবা রা. মদীনায় ইন্তেকাল করেন।
১০ম স্ত্রী: সাফিয়্যা রা.। ১৭ বছর বয়সী সাফিয়্যা রা. কে ৫৯ বছরে ৭ হিজরীতে বিবাহ করেন। ইনি হিজরী ৫০ সালের রমজান মাসে ইন্তেকাল করেন।
১১তম স্ত্রী: মায়মুনা রা. কে বিয়ে করেন ৭ হিজরীতে। বিয়ের সময় মায়মুনা রা. এর বয়স ছিল ৩২ বছর। হিজরী ৫১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
১২তম স্ত্রী: রায়হানা বিনতে শামউন রা. কে বিয়ে করেন হিজরী ৭ সালে। বয়স ছিল আনুমানিক ২৮ বছর। মুত্যুর সঠিক তারিখ জানা যায় নাই। রায়হানা ছিলেন ইহুদী কন্যা। হাকাম নামক ব্যক্তির সাথে ১ম বিয়ে হয়। মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে হাকাম নিহত হয় এবং রায়হানা বন্দী হন। তাঁকে ইসলাম কবুলের দাওয়াত দিলে কবুল করেন এবং নবীকে বিয়ে করেন।
১৩তম স্ত্রী: মিসরের কিবতী নারী। ধর্মে খৃষ্টান। ইসকান্দারিয়ার রোমান শাসক মেকিউরিয়াসের নিকট হযরত নবী করিম সা. হিজরী সনের ১ম ভাগে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একখানা পত্র লিখেছিলেন। পত্রের বাহক ছিলেন বিচক্ষণ সাহাবী হযরত হাতেব ইবনে আবী বালতাআ রা.। মেকিউরিয়াস প্রিয় নবীজীর সা. পত্র এবং পত্রবাহকের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সেদেশের রাজকীয় রীতি অনুযায়ী পত্রের জবাব ও শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ মারিয়া ও শিরীন নামীয় সম্ভ্রান্ত মেয়েকে নবীর খেদমতে প্রেরণ করেন। দু’জনই পথিমধ্যে হযরত হাতেম রা. এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী করিম সা. শিরীন রা. কে প্রখ্যাত কবি হাসসানের সাথে বিয়ে দেন আর ২৩ বছর বয়সী মারিয়া কিবতিয়াকে হিজরী ৮ সালে নবী নিজে বিয়ে করেন। মুত্যুবরণ করেন হিজরী ১৬ সালে।

(আগামী পর্বে থাকবে নবীজী সন্তানাদির পরিচয় ও আহলে বাইয়াতের বংশধারা। চোখ রাখুন চলমান বার্তায়)

আরও পড়ুন >> মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ম পর্ব)

রোজার তাৎপর্য ও গুরুত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়