হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৫ম পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শুক্রবার, মে ১৭, ২০১৯ ১১:৫০:২৭ পূর্বাহ্ণ
Prophed
প্রিয় নবী স. এর ব্যবহৃত তরবারি। ছবি : ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে চলমান বার্তার সম্মানিত পাঠকদের জন্য মহানবী সা. এর জীবনী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকে রয়েছে নবী সা. এর জীবনের জিহাদ।

নবীর জীবনে জেহাদ:
নবী করীম সা. এর জীবদ্দশায় মোট ২৭টি যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল। এছাড়া ছোট বড় অন্যান্য অভিযান মিলিয়ে সশস্ত্র অভিযানের সংখ্যা ছিল ৮২টি। তাঁর মধ্যে নবী সা. স্বয়ং ৮টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ৮২টি সশস্ত্র অভিযানে সর্বমোট লোক নিহত হয়েছিলেন ১০১৮ জন। তন্মধ্যে মুসলিম শহীদের সংখ্যা ছিল ২৫১ জন। প্রতিপক্ষের নিহতের পরিমাণ ৭৫৯ জন। কোন যুদ্ধেই হযরত রাসুলে করীম সা. প্রতিপক্ষের উপর অস্ত্র প্রয়োগ করেননি। ফলে তাঁর দ্বারা কেউ নিহত বা আহত হয়নি। ৮ম হিজরীতে হুনাইন যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের এক ব্যক্তি হঠাৎ নবীজির উপর আক্রমণ করলে হুযুর সা. একটা গাছের ডাল দিয়ে তার গায়ে আঘাত করেছিলেন।

মোহাম্মদ সা. যখন সেনাপতি:
নবী করীম সা. মোট ৮টি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে সৈন্য পরিচালনা করেছেন। যথাক্রমে: হিজরী ২য় সনে ১৭ রমজান অনুষ্ঠিত বদর যুদ্ধ, ৩য় সনে উহুদ যুদ্ধ, ৫ম সনে আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধ, ৬ষ্ট সনে হোদায়বিয়ার অভিযান, ৭ম সনে খায়বর যুদ্ধ, ৮ম সনে মোতা অভিযান ও মক্কা বিজয় এবং একই সনে হুনাইন যুদ্ধ। প্রতিটি যুদ্ধে তিনি জয়যুক্ত হয়েছিলেন।

বদরের যুদ্ধে ১৩ শহীদের নাম:
মক্কার বিধর্মীদের এক হাজার সুসজ্জিত বাহিনীর সাথে মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধার মধ্যে সংঘঠিত হয় প্রথম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কাফেরদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দী হয়। পক্ষান্তরে মোট চৌদ্দজন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের নাম যথাক্রমে-১। ওবায়দা ইবনুল হারেস রা., ২। ওমায়র ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা., ৩। যুশশেমালাইন ইবনে আবদে আমর রা., ৪। আকেল ইবনে বুকাইর রা., ৫। মাহজা ইবনে সালেহ রা., ৬। সাফওয়ান ইবনে বাইদা রা., ৭। সা’দ ইবনে খাইসামাহ্্ রা., ৮। বেশ্্র ইবনে আবদুল সুনযের রা., ৯। ইয়াযীদ ইবনুল হারেস রা., ১০। ওমায়র ইবনুল হামাম রা., ১১। রাফে ইবনুল মুয়াল্লা রা., ১২। হারেসা ইবনে সুরাকা রা., ১৩। আওফ ইবনুল হারেস রা. ও ১৪। মুয়াওয়ায ইবনুল হারেস আনসারী রা.।

হুদাইবিয়ার সন্ধি:
হযরত রসুলে করীম সা. এর সাথে মক্কার কাফেরদের সাথে হিজরী ৬ সালে হোদায়বিয়া নামক স্থানে একটি বাবলা গাছের নীচে সন্ধি করেন। ইতিহাসে যা হোদায়বিয়ার সন্ধি বা চুক্তি নামে পরিচিত। উক্ত চুক্তিতে মোট ছয়টি শর্ত ছিল:
১। আগামী দশ বছর উভয় পক্ষ পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকবে।
২। কোরাইশদের মধ্য থেকে কেউ ইসলাম কবুল করেও যদি মদীনায় চলে যায়, তবে তাকে ফেরৎ পাঠাতে হবে।
৩। পক্ষান্তরে কোন মুসলমান যদি মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসে তবে তাকে মক্কাবাসীরা ফেরৎ পাঠাতে বাধ্য থাকবে না।
৪। চুক্তির সময়সীমার মধ্যে কোন পক্ষই অপর পক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে না। এক পক্ষ অন্য পক্ষের কোন আর্থিক ক্ষতিও করবে না।
৫। হযরত মোহাম্মদ সা. এ বছর এখান থেকেই ফেরত যাবেন। আগামী বছর তাঁরা ওমরাহ করতে পারবেন। এ উপলক্ষে তাঁদেরকে শুধু তিনদিন মক্কায় অবস্থান করার সুযোগ দেয়া হবে। তবে তাঁরা সাথে করে শুধু তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র আনতে পারবেন না এবং তরবারি কোষবদ্ধ রাখতে হবে।
৬। আরবের অন্যান্য গোত্রগুলো নিজেদের পছন্দমত যেকোন পক্ষের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে কোন পক্ষই বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

মক্কা বিজয়:
তের বছর মক্কার কাফেরদের জুলুম নির্যাতনের পর মক্কা বিজিত হয়। মক্কা বিজয়ের দিন কা’বা শরীফ প্রাঙ্গনের সকল মূর্তি অপসারণ করা হয়। মদীনায় হিজরতকালীন আট বছর পর মক্কার যে সকল কাফের নবীজিকে অত্যাচার করেছিল তাদের প্রত্যেককেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তবে ১৬ জন ব্যাক্তি, যাদের অপরাধ ছিল জঘন্য এবং সুনির্দিষ্ট তাদের হত্যার নির্দেশ দেন। কিন্তু এই ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন নিজ কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলে দয়ার নবী তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং তারা ইসলামে দীক্ষিত হন। এই ১২ জনের মধ্যে নবীজির চাচা হামযা রা. এর হত্যাকারী ওয়াহশী ও হযরত হামযার রক্তপানকারী হিন্দাও ছিলেন। বাকী ৪ জন দুর্বৃত্ত নিহত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল:
(১) মাকীস ইবনে সাবানা। তিনি মদীনায় হিজরতকালে ভুলক্রমে নিজের বড়ভাই নিহত হওয়ার পর রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উক্ত আনসারীকে হত্যা করে মক্কায় পালিয়ে এসেছিল। কা’বা প্রাঙ্গনে তাকে হত্যা করা হয়।
(২) কুরাইনা নান্মী এক গায়িকা যিনি নবীর বিরুদ্ধে কাফেরদের মদ্যপ মজলিসে জঘন্য কুৎসামূলক গান গেয়ে আনন্দ দান করতেন। মক্কা বিজয়ের প্রথম দিনই এই নারী ধৃত ও নিহত হন।
(৩) হুয়ায়রেছ ইবনে নুকাইদ নামক জনৈক কবি যিনি হযরত নবী করীম সা. এর নিন্দা করে অশ্লীল কাব্য রচনা করতো। হযরত আলী রা. এর হাতে ধৃত হয়ে নিহত হন।
(৪) আবদুল্লাহ ইবনে খাত্তাল। এ ব্যক্তি মদীনায় হিজরত কালে এক অঞ্চলের রাজস্ব আদায় করে একজন মুসলমানকে হত্যা করে অর্থসহ মক্কায় পালিয়ে এসেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন এ ব্যক্তি কা’বা প্রাঙ্গনে নিহত হন।

(আগামী পর্বে থাকছে কবে হয়েছিল প্রথম জুমার নামাজ, ঈদের নামাজ ও অন্যান্য বিষয়)

আরও পড়ুন:

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ম পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (২য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৩য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৪র্থ পর্ব)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়