মিথ্যে ভালো থাকা

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৬, ২০১৯ ১১:৩৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
Lost love

মিথ্যে ভালো থাকা
মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

মিথ্যে বলা মহাপাপ-এই চিরন্তন সত্যটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচি থেকে আত্বস্থ করে প্রতিটি কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বলা হয় কোন ধর্মেই মিথ্যার স্থান নেই। মুসলিম ধর্মে মিথ্যা বলাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে জোড়ালোভাবে। তবু মানুষ মিথ্যা বলে। কেউ ইচ্ছে করে, কেউ বা আবার বিপদে পড়ে। নিজ সংসারের সুখচিত্র বন্ধু তথা পরিচিত মহলে তুলে ধরার জন্য মিথ্যা বলা খুবই বিরল। সামসুল ইসলাম চৌধুরী। ভদ্রলোক নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করেছেন প্রায় ২৫ বছর হলো। বিয়ের পর থেকেই নিজের পরিবার সম্পর্কে বন্ধু মহলে বানোয়াট সব মিথ্যা বলে নিজেকে সব সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখি মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতো। স্ত্রী ফারজানা, ছেলে তমাল, মেয়ে মনি ও তন্বি সবাইকে নিয়ে একটি সুখি পরিবার। বন্ধুরা এনিয়ে অনেক সময় ওকে হিংসা করতো। বন্ধুরা বিয়ের পর কখনো সামসুলের বাসায় যেতে পারেনি। যেতে চাইলেই বলতো, আজ ছেলের পরীক্ষা তো পরশু মেয়ের পরীক্ষা। পরীক্ষা না থাকলে স্ত্রীর শরীর খারাপ। অনেক চেষ্টা করেও বন্ধুদের নিজের চোখে বন্ধুর সুখ দেখা হয়নি। তবে সামসুল ঠিকই বন্ধুদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতো। বন্ধুদের সাথে জম্পেশ আড্ডা ছিল ওর প্রিয় একটি বিষয়। সপ্তাহে একদিন আড্ডা মারা চাই-ই চাই। কয়েক দিন আগে বন্ধুরা সবাই মিলে পুরনো জায়গা টিএসসি’র মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। বন্ধুদের অনেকেই লক্ষ্য করে সামসুলের শরীরটা বেশ খারাপ। আজকে আর বাসার কাউকে নিয়ে কোন কথা বলছে না। বন্ধু আরমান বলে, তোর এমন শরীর খারাপ নিয়ে আজ না আসলেও পারতি। জবাবে সামসুল বলল, তোদের সাথে আড্ডা মেরে শরীরটা ভালো করবো বলেই তো এসেছি। তোরা মজার মজার গল্প কর আমি শুনি। তোদের গল্প শুনতে আজ খুব ইচ্ছে করছে। বন্ধু কামরুল বলল, এত সুন্দর পতিব্রত স্ত্রী, আদর্শ ছেলে-মেয়ে রেখে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে সত্যিই তোর আসা ঠিক হয়নি। হাসতে হাসতে সামসুল বলল, আরে ওরা তো আছেই, তাই বলে কি ওরা বন্ধুর অভাব পুরণ করতে পারবে নাকি? তোরা হলি গিয়ে আমার সত্যিকারের বন্ধু-বলেই বুকে হাত দিয়ে চেপে ধরে। আর কথা বলতে পারে না। বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। আড্ডা শেষে এক বন্ধু নিজের গাড়িতে সামসুলকে মগবাজারের বাসায় পৌঁছে দেয়।

বাসায় ফিরে নিজের রুমে কোনো রকমে কাপড় পরিবর্তন করে লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ে সামসুল ইসলাম। চোখের কোণায় জমে যায় জল। শরীরের ঘামের সাথে মিশে যায় সে পানি। বেদানাশ্রুর সাথে ঘর্মাক্ত পানি মিশে বালিশে জায়গা করে নিচ্ছে। একমাত্র ছেলেটি ছাড়া স্ত্রী আর মেয়েদের বৈরী আর বিরূপ আচরণে সামসুল ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মানসিক কষ্ট ভোগ করতে করতে আজ দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে দেখা দিয়েছে মরণ ব্যাধি। ইচ্ছে থাকলেও কাউকে বলতে পারছে না। বুঝতে দিচ্ছে না কাউকেই। ঔষুধ যা খাওয়ার তাও খাচ্ছে লুকিয়ে। সামসুলের ভয় হয়তো শরীরের এই অবস্থার কথা স্ত্রী, কন্যারা বিশ্বাস নাও করতে পারে। শরীরের পরিবর্তন লক্ষ্য করেও যাদের অন্তরে এতটুকু সহানুভুতি জাগ্রত হয়নি তাদেরকে আর বলেই কি হবে। বাসা ভাড়া দেয়া, বাজার করা, ছেলে-মেয়েদের পড়ার খরচ মেটানো আর স্ত্রীর অপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করার জন্যই হয়তো সামসুলের জন্ম হয়েছে। যদিও এগুলো পূরণে কখনোই কার্পণ্য করেনি সামসুল। আয় দিয়ে পূরণ না হলে ঋণ করে হলেও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু বিবাহিত জীবন থেকে শুরু করে সংসার জীবনের প্রাপ্তিটা হিসেব করলে শূণ্যের বেশি কিছু মিলবে না। শুধুমাত্র নাক ডাকার অজুহাতে ২৩ বছর যাবৎ আলাদা রুমে ঘুমাতে হয় ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রী পাগল সামসুলকে। বিয়ের পরই যখন বুঝতে পারলো স্ত্রীকে দিয়ে নিজের পছন্দ আর ভালোলাগার বিষয়গুলি কখনই পূরণ হবার হয় তখন থেকেই লোকচক্ষুর ভয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে জীবনের পথ চলেছে।

ডাক্তার আরিফ। সামসুলের কলেজ জীবনের বন্ধু। কর্মস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আর বিকেলে ধানমন্ডির চেম্বার। অফিস শেষে সোজা চলে যায় ওর কাছে। তখনও এসে পৌঁছায়নি আরিফ। ওয়েটিং রুমে বসে আছে চুপচাপ। এরই মাঝে বন্ধু কামরুল এসে হাজির। বন্ধুকে দেখেই জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার পরশে। বলে, বাইরে বসে আছিস কেন? চল চেম্বারের ভিতর গিয়ে বসি। বন্ধুদের এমন পরশই যেন বাঁচিয়ে রেখেছে সামসুলকে। তাহলে ডাক্তার দেখাতে এসেছিস শেষ পর্যন্ত। খুব ভালো হয়েছে। আমিও এসেছি ফজলকে দিয়ে একটু চেকআপ করাতে। সামসুলের বুকের ব্যাথা বেড়ে যাচ্ছে মনে হয়। সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এরই মাঝে ডাক্তার আরিফ ঢোকে চেম্বারে। বন্ধুদের দেখে মনটা খুশিতে ভরে যায়।

-কি খবর তোদের, আরিফে প্রশ্ন। তোদের তো আর অসুখ না হলে আমার কথা মনেই থাকে না। তা বল কেমন আছিস। কথার ফাঁকে সামসুলের কাতরতা দেখে আরিফ চমকে উঠে। কিরে একি অবস্থা তোর। দেখি বেডে শুয়ে পড়। ভালো করে চেকআপ করে ডাক্তার আরিফের গা ঘামতে শুরু করে এবার। হাসিমুখে অথচ কঠিন কণ্ঠে প্রশ্ন করে সামসুলকে। এতদিন আসিসনি কেন? আর কোন ডাক্তার দেখিয়েছিস। সামসুল শুধু না সূচক মাথা নাড়ে। কিছু টেষ্ট আজই করতে বলে সামসুলকে। আর কিছু ঔষুধ লিখে দেয়। আরিফ কামরুলকে বলে আজই যেন সামসুলের টেষ্টগুলো করানো হয়। তুই সাথে থেকে টেষ্টগুলো করাবি আর কালদিন পর রিপোর্ট নিয়ে আমার কাছে আসবি। কামরুল সামসুলকে নিয়ে রুম থেকে বের হতেই আবারও ফিরে যায় আরিফের কাছে। বলে, ওর কি খারাপ কিছু হয়েছে? ফিস ফিসিয়ে আরিফ বলল, খারাপ কিছু না, মহা খারাপ কিছু একটা মনে হচ্ছে আমার।

চেম্বার থেকে বেড়িয়ে কামরুল সামসুলকে টেষ্ট করাতে নিতে চাইলেও সামসুল রাজি হয় না। বলে অল্প কিছু দিন পর বড় মেয়েটার বিয়ে। সেখানে কত টাকা লাগে কে জানে। ছেলেটা আবার চলে যাবে স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকায়। ওর টিকিট করতে হবে, কিছু কেনাকাটাও করা দরকার। আমার যা হবার হবে। এ নিয়ে চিন্তা করিস না। আমার চেয়ে ওদের ভবিষ্যতটাই আগে।
-তাই বলে নিজের চিকিৎসা করাবি না এটা কেমন কথা। না না চল। তুই টাকা না দিস সমস্যা নেই, আমি তোকে চিকিৎসা করাবো। কামরুল একপ্রকার জোর করে সামসুলকে নিয়ে যায় টেষ্ট করাতে। সকল টেষ্ট করিয়ে রাত ১০টার দিকে কামরুল সামসুলকে নিয়ে যায় ওদের বাসায়। সামসুল যেন আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছিল। তাই হয়তো আজ বাসায় যেতে কামরুলকে বারণ করলো না। কলিং বেল টিপতেই স্ত্রী দরজা খুলে ঝাঁঝাঁলো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, এত দেরি হলো কেন শুনি। আর কোন প্রকার খবর না দিয়ে কাকে সাথে আনলে। আস্তে আস্তে সামসুল বলে, ও আমার বন্ধু কামরুল। স্ত্রী বলল, সে যেই হোক আসার আগে খবর দিলে কি এমন হতো।
বন্ধুর স্ত্রীর আচরণে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় কামরুল। আস্তে আস্তে সামসুলকে ওর বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের হাতে ঔষধ খাইয়ে চলে আসছিল সে। অসুস্থ সামসুল বুকের কাছে হাতটা টেনে নিয়ে বলে আমার স্ত্রীর এমন আচরণ যেন আর কাউকে অর্থাৎ কোন বন্ধুকে না বলি। কামরুল বলে, আমি বুঝেছি বন্ধু তোর ভালো থাকা। তোর সংসার জীবনের বৈরীতাই তোকে মিথ্যাবাদী করে তুলেছে আর তুই এসব ভেবেই এমন রোগ বাঁধিয়েছিস। তুই ভাবিস না, আর যাই হোক আমরা তোকে বিনা চিকিৎসায় মরতে দিব না। কামরুল বলল, কাল সকালে তোকে নিয়ে যাবো এনজিও গ্রাম করাতে। তুই তৈরি থাকিস।

রিপোর্টগুলো নিয়ে কামরুল নিজেই যায় ডাক্তার আরিফের কাছে। রিপোর্ট দেখে আরিফের কপালে ভাঁজ পড়ে যায় কয়েকটা। কেনো এমন হলো ওর ভাবতে পারে না। এমন সদাহাস্যোজ্জল বন্ধুর এমন পরিণতি যেন মানতে পারছে না কোনোভাবেই। কামরুল জানতে চায় কি হয়েছে সামসুলের। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছতে মুছতে বলে, সামসুলের বুকে চারটি ব্লক আছে। জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করাতে হবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কামরুল বলে, অপারেশনের পরও ওকে বাঁচানো যাবে বলে মনে হয় না। আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে আরিফ, কেন? ওর কি অন্য কোন সমস্যা আছে?
-সমস্যা। হ্যাঁ সমস্যা তো আছেই। একটা মানুষ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পরিবার থেকে যে যন্ত্রণা সহ্য করছে তা থেকে মুক্তি না পেলে ও সত্যি বাঁচবে না। জানিস আরিফ, পরশু রাতে তোর এখানে ওকে নিয়ে প্রথম ওর বাসায় যাই। তুই ভাবতে পারবি না, ও সারা জীবন পরিবার নিয়ে যা বলেছে সব মিথ্যা, বানোয়াট।
-মানে?
-স্ত্রী সন্তানদের কাছ থেকে যত প্রকার মানসিক কষ্ট পাওয়া যায় তার সবই যেন ও ভোগ করছে। বন্ধুদের কাছে মিথ্যে বলে নিজেকে সব সময় হালকা করার চেষ্টা করেছে। আমি নিজের চোখে যা দেখে এসেছি তা কোন মানুষের প্রাপ্য হতে পারে না। স্ত্রী সন্তানদের জন্য একজন মানুষ এমনভাবে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারে অকাতরে তা ভাবতেই কষ্ট হয়। আমি জানি সামসুলের স্ত্রী হয়তো অসুখের বিষয়টি বিশ্বাসই করবে না।
-কি বলছিস এসব।
-একদিনেই যা দেখেছি তাই তোকে বললাম। আমার ধারণা এর থেকে আরো বেশি কষ্ট আর যন্ত্রণা ভোগ করে ও প্রতিনিয়ত। যে কারণেই ওর আজকের এ পরিণতি। আমরা বন্ধুরা মিলে হয়তো ওর অপারেশন করাতে পারবো, ভালো করতে পারবো। কিন্তু সে ভালো থাকতে পারবে না জীবনের বাকি দিনগুলি।
আজকে ওদের আড্ডা দেয়ার কথা। কিন্তু সামসুল না আসায় বন্ধুরা সবাই ওর বাসায় যায়। ছোট্ট কক্ষে লাইট বন্ধ করে শুয়ে আছে কাঁথা মুড়ি দিয়ে। বন্ধুদের দেখে ওর বউ খুশি হতে পারেনি সেটা বোঝা গেল সহজেই। ছেলেটা বাবার পাশে বসে থাকলেও স্ত্রী পাশের রুমে স্টার প্লাসের সিরিয়াল দেখছে মন দিয়ে আর বড় মেয়েটা কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত আর ছোট মেয়েটা কানে হেয়ার ফোন লাগিয়ে গান শুনছে। এই হলো সামসুলের সুখি পরিবারের চিত্র। কি অদ্ভুদ মানুষ! নিজে মরে যাচ্ছে তিলে তিলে অথচ পরিবারের কারোরই যেন অসুস্থ মানুষটার পাশে বসার মত সামান্যতম সময় হচ্ছে না। রিপোর্টে কি এসেছে জানতে চায় সামসুল। কামরুল বলে তেমন কিছু। তবে তোর একটা অপারেশন করাতে হবে। আরিফ বলেছে সামান্য অপারেশন। বেশি সময় লাগবে না। আর ওর এক বন্ধুর ক্লিনিকে অপারেশন করবে। তাতে পয়সা যা লাগে তা আমরা সবাই মিলে শেয়ার করলেই হয়ে যাবে।
অস্ফুট কণ্ঠে সামসুল বলল, তোরা আমার মত আমাকে মিথ্যে বলছিস, না। আমি জানি আমার কি হয়েছে। রিপোর্ট তোর কাছে থাকলেও আমার শরীর বলছে অন্য কথা। কামরুল বলল, আমরা অতো সব বুঝি না কালকে তোকে আমরা ভর্তি করাবো। আমরা তোকে বিনা চিকিৎসার মরতে দেবো না।
-অপারেশন আমি করাবো। তবে কটা দিন পর। সপ্তাহ খানেক পরই বড় মেয়েটার বিয়ে। তার এক সপ্তাহ পর ছেলেটা আমেরিকা চলে যাবে স্কলারশীপ নিয়ে। তার পর আমার আর কোন কাজ থাকবে না। তখন অপারেশনটা করিয়ে ফেলবো। তোরা ভাবিস না।
সারা বাসায় বিয়ের আয়োজন। ধুমধামের কোন কমতি নেই। মেয়ের যা যা চাই সবই কেনা হয়েছে। বর ওর পরিচিত। বলতে গেলে লাভ ম্যারেজ। পরিবার শুধু সম্মতি দিয়ে গেছে মাত্র। অসুস্থ শরীর নিয়ে গত তিন চার দিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছে সামসুল। নিজে কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু পরিবারের কাউকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিচ্ছে না। সামসুলের বন্ধুরা সবাই এসেছে বিয়েতে স্বপরিবারে। সামসুল তাকিয়ে আছে বন্ধুদের পরিবারের দিকে। কি ভালোবাসা, কি মহব্বত নিয়ে ওরা আড্ডা দিয়ে যাচ্ছে, গল্প করছে। আজ কেন জানি নিজেকে বড় বেশি অসুখি মনে হচ্ছে নিজেকে। বিয়ের পর স্ত্রীর কথায় বাবা-মাকে প্রায় ভুলেই ছিলাম। একটি দিনের জন্য আমার বাবা-মা, ভাই-বোন আমার বাসায় আসতে পারেনি। আমার আত্মীয় স্বজনদের এ বাসায় আসার উপর ছিল কড়া নিষেদাজ্ঞা। এর জন্য বাবা-মা সহ আপন জনেরা কোনোদিনই আমাকে অভিশাপ দেননি। অফিসের কাজের কথা বলে নিজে বাড়ি গিয়েছি লুকিয়ে। নিজের ভুলের জন্য বার বার মাফ চেয়েছি ওনাদের কাছে। এতবড় অন্যায় করার পরও পিতা-মাতা আমাকে কোনোদিন গালমন্দ করেননি। নিয়মিত টাকা পাঠাতাম কিন্তু কখনো স্ত্রীকে বুঝতে দিতামনা। ঈদের দিনে বেশি মনে পড়তো বাবা-মাকে। বিয়ের পর কোনোদিন আর বাড়িতে বাড়ির সদস্যদের সাথে ঈদ করা হয়নি।

জামাই এসেছে। ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই। খাবার পর্ব শেষ করে মেয়ে আর জামাইকে বিদায় দেবার পালা। সবাই চলে যাচ্ছে। বুকের ব্যাথাটা যেন আরো বেড়ে যাচ্ছে সামসুলের। সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি আর কারো নজরে না পড়লেও কামরুল আর ডা. আরিফের দৃষ্টি এড়ায় না। এগিয়ে গিয়ে সামসুলকে ধরতেই ঢলে পড়ে ওদের কোলের ওপর। ধরাধরি করে বিছানায় নেয়া হয়। আর যেন পারছে না সামসুল। স্ত্রী, ছেলে আর ছোট মেয়েটা কাছে এসে দাঁড়ায়। বাবার অবস্থা দেখে ছেলেটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। স্ত্রী আর ছোট মেয়েটা তখনও নির্বিকার। যেন কিছুই হয়নি সামসুলের। ছেলেটাকে কাছে টেনে নেয়। অস্ফুট স্বরে বলে আলমারিতে রাখা লাইফ ইন্স্যুরেন্সটা তোমার মাকে দিও, ছোট বোনের জন্য রইল দুই লাখ টাকার এফডিআর। তোমার জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না বাবা। শুধু রইল আমার অন্তর থেকে প্রাণখোলা দোয়া। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। শক্ত করে ধরা ছেলের হাতটা মুহূর্তের মধ্যেই আলগা হয়ে পড়ে যায় বিছানায়। ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রীর ভালোবাসায় নয়, জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসা দেয়া মেয়েদের শ্রদ্ধায় নয়, বন্ধুদের অফুরান ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পৃথিবীর মায়ায় ছেদ টানে মিথ্যেবাদী সামসুল ইসলাম।

আরও পড়ুন: জীবনের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়