রেল কর্মকর্তা মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী; গান-কবিতা ও সৃজনশীল কর্মের অনন্য উদাহরণ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বুধবার, জুলাই ২৭, ২০২২ ৭:৫৮:১৮ অপরাহ্ণ

এম. মাহমুদ:
‘আমার দিকে তাকিয়ে দেখ তো/আমাকে যায় কী চেনা/একাত্তরে যুদ্ধ করেছি/আমি যে মুক্তিসেনা’, ‘জোছনার জলে গা ভিজিয়েছি/খুলেছি এলোকেশ/রুপালি চাঁদের সাথে মিতালী হয়েছে বেশ’, ‘তুমি ইতিহাসজুড়ে সর্বশ্রেষ্ঠ মহানায়ক এই বাংলার’ দেশপ্রেম ও আত্মমগ্ন ভাবনার এমন শতাধিক জনপ্রিয় গান লিখেছেন মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী। এসব গানে উঠে এসেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা তথা দেশমাতৃকার প্রতি অতুলনীয় আবেগ ও ভালোবাসা।
তার গানের সুরারোপ করেছেন দেশের খ্যাতিমান সুরকার শাহজাহান, নজরুল ইসলাম, মোস্তাক সহ আরো অনেকে। বেশ কিছু গানে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশ বরেণ্য শিল্পী আবদুল জব্বার, সৈয়দ আবদুল হাদী, রফিকুল আলম, শাকিলা জাফর, শাম্মী আকতার, ফকির আলমগীর, ফাহমিদা চৌধুরী, ভারতের জো জো, অমিত গাঙ্গুলি প্রমূখ। তার এ্যালবাম দু’টি বেরিয়েছে।

বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হওয়ায় মঞ্জুর-উল-আলমের লেখা গান নিয়মিতই প্রচার হয় রাষ্ট্রায়ত্ত এই দুই প্রতিষ্ঠানে। সবশেষ বাংলাদেশ বেতার আয়োজিত ঈদ নকশা অনুষ্ঠানে যে পাঁচটি গান প্রচার করা হয়, তার সবগুলোই তার লেখা।

একবার স্বাধীনতা দিবসে গানটি বঙ্গভবনে লাইভ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন আব্দুল জব্বার। তখনো আব্দুল জব্বার চিনতেন না এই গানের গীতিকার মঞ্জুর-উল-আলমকে। গানটি গাওয়ার পর সংগীত পরিচালকের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে ফোন করেছিলেন তাকে। বলেছিলেন, “আমার গাওয়া হাজার গানের মধ্যে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ গানটি অন্যতম।” মঞ্জুর-উল-আলম বলেন, তার মতো একজন কিংবদন্তী শিল্পীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য পাওয়া ভীষণ গর্বের বিষয়।

সম্প্রতি মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তার লেখা গান ‘মহানায়ক’ রিলিজ পেয়েছে জি সিরিজের ব্যানারে। গানটিতে সুরারোপ করেছেন সুরকার রাজেশ এবং কণ্ঠ দিয়েছেন ওয়ারফেজ ব্যান্ডের সাবেক ভোকালিস্ট মিজান। রিলিজের পর থেকে সর্বস্তরের শ্রোতাদের মাঝে গানটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। প্রশংসিত হয়েছে বোদ্ধা মহলে।

ভারতের অমিত গাঙ্গুলির গাওয়া ‘ভরা বরষা’ গানটির জন্য ভারতের ইন্দোবাংলা কালচারাল সোসাইটি তাঁকে শ্রেষ্ঠ গীতিকারের সম্মানে ভুষিত করে। গানের পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যতিক্রমী ইমেজ গড়ে তুলেছেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম কবিতা লিখেন মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী। কবিতার নাম ‘মুক্তিযোদ্ধা’। কবিতাটি সুরারোপ করে কণ্ঠ দেন রাজশাহী বেতারের নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী শাজাহান।

শিক্ষাজীবনে প্রচুর বই পড়তে তিনি। প্রিয় উপন্যাস বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। ওই উপন্যাসে একজন রেলওয়েকর্মী দীপংকর নামের চরিত্রটি তাকে সাংঘাতিক নাড়া দেয়।

অনন্য গুনাধীকারী মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী লেখার ক্ষেত্রে বেশ স্বপ্নচারী। ভাবনার সাথে লেখার রয়েছে অনুপম সাদৃশ্য। তিনি যে কোন ভাবনাকে শিল্পিত রূপ দেন এক নিমিষেই। তার লেখনীতে বিচরণ করে শিল্পের সাথে সাথে বিজ্ঞান বিষয়।

সাহিত্য-সংস্কৃতির বাইরেও একজন সৎ, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী সুপরিচিত। ১০ম বিসিএসে রেলওয়ের দুইটি ক্যাডারে কর্মরতদের মধ্যে পিএসসির মেধাতালিকায় প্রথম ছিলেন তিনি। তার পরিকল্পনাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভ্রাম্যমাণ রেল জাদুঘর’, যা গত ২৭ মে উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এই জাদুঘর নির্মাণের মূল ভাবনা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বলতে গেলে একক প্রচেষ্টায় করেছেন মঞ্জুর-উল-আলম। রেলমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই অভিনব উদ্ভাবনী কাজটির প্রশংসা করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শিগগিরই জাদুঘর দুইটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশনসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্টেশনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর জীবন ইতিহাসকে পৌঁছে দেবে সাধারণ মানুষের মাঝে।

বর্তমানে রেলওয়ে তাদের সেবা বহুমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি স্কয়ার হাসপাতালের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ করতে যাচ্ছে ইমারজেন্সি হসপিটাল কাম অ্যাম্বুলেন্স। এই কাজের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী। পাহাড়তলি কারখানায় একটি এয়ারব্রেক সম্বলিত কোচ নির্ধারণ করে মোডিফিকেশন কার্যক্রম চলছে। শিগগিরই এই রেল অ্যাম্বুলেন্স ও সেবা দিতে শুরু করবে।

মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরীর আরেকটি ব্যতিক্রমধর্মী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় শহিদ হওয়া শ্রমিকদের স্মরণে ‘অদম্য স্বাধীনতা’ নামে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ। সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়ে ২০১৩ সালে রেলের অকেজো যন্ত্রাংশ ও মালামাল দিয়ে নির্মাণ করা হয় এই স্মৃতিসৌধ।

রেলওয়ের নানা উদ্যোগের মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে তার সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। রেলমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে মূল দায়িত্ব পালন করছেন মঞ্জুর-উল-আলম। ভারতীয় রেলের রাইটস (RITES- Rail India Technical and Economic Services) এবং বাংলাদেশের আইআইএফসি’র (IIFC) গঠন ও কার্যাবলি পর্যালোচনা করে রেলের জন্য যুগোপযোগী একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত রেলের উন্নয়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে পোড়া লোকমোটিভ ও ডেমু পুনর্বাসন, দেশেই রেল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ তৈরির উদ্যোগও তার হাত দিয়েই নেওয়া।

এভাবেই কর্মস্থলে নানামুখী অবদান রাখার পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেই আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী। তার ভাষায়, অনেক কিছু করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু জীবন অনেক ছোট। এই ছোট্ট জীবনেও সাধ্যমতো অবদান রেখে যেতে চাই সবার মাঝে।

আরও পড়ুন : মঞ্জুর উল আলমের ‘মহানায়ক’ এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে

জনপ্রিয়