শিরোনামহীন খবর

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : বুধবার, মে ৮, ২০১৯ ১১:০৮:৪১ অপরাহ্ণ
Story

শিরোনামহীন খবর
মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

চারিদিকে সারি সারি দাড়িয়ে আছে গাড়িগুলো। নিশ্চুপ হয়ে অচল দেহে। এ্যাম্বুলেন্সের কর্কশ আওয়াজও যেন ঘুম ভাঙ্গাতে পারছে না ঢাকা শহরে জমাটবাধা যানজটের। নিথর দেহ নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণার মায়ের কোলে শুয়ে আছে আজিম। যাত্রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তিন ঘন্টার রাস্তায় সকাল ৮টায় সিরাজগঞ্জ থেকে রওনা করে বিকাল ৩টায় কাকলীর মোড়ে। সামনের যা অবস্থা তাতে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আকুতি ভরা চাহনি বিধবা মায়ের। কোন দোষ করেনি আজিম। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মারামারি মাঝে পড়েছিল। তাতেই অজ্ঞানাবস্থায় স্থান পায় সিরাজগঞ্জ মেডিকেলে। আঘাত ততটা গুরুতর না হলেও ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসতে হচ্ছে ওকে। সেখানকার ডাক্তার বলেছে যত দ্রুত সম্ভব বড় ডাক্তারের কাছে যেতে।

মা, সামনে কি হয়েছে? অস্ফূট কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে আজিম। মা উত্তর দেয়ার আগেই চালক বলে, সামনে অনেক জ্যাম ভাইজান। রাস্তার জ্যামের সাথে সাথে শরীরটাও যেন আস্তে আস্তে অচল হয়ে পড়ছে আজিমের। মায়ের চোখের সামনে ভেসে উঠে ছেলের কত স্মৃতি। কত বাহানা ছিল ওর। বাবা মারা যাওয়ার পর একমাত্র ছেলেই ছিল তার স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। পড়াশোনা শেষ হলে নিজ বোনের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিবেন। আজিমও অনেক ভালোবাসতো শিল্পীকে। এম.এ পাশ করার পরই ওদের বিয়ে হওয়ার কথা। চাকরি না পেলেও মায়ের আবদার আগে ঘরে বউ আনবে।

মা, শিল্পী কি জানে আমি ঢাকায় যাচ্ছি। হ্যাঁ বাবা জানে। ও সব জানে। স্বপ্নের ডানাগুলো যেন ফিকে হয়ে আসে আজিমের। ভিতরে কেবল যন্ত্রণা। আমিতো কোনদিন রাজনীতি করিনি। কোন দলকে সমর্থনও করিনি কখনও। ক্যাম্পাসে গিয়েছি শুধুমাত্র মায়ের ছোট্ট চাওয়াকে পূরণ করতে। তবে কেন আমার এমন হলো। হিসাব মেলাতে পারে না আজিম।

গাড়ী চলতে শুরু করেছে। মা এবার আশায় বুক বাঁধে। এবার নিশ্চয়ই আর কোন জ্যাম থাকবে না রাস্তায়। আমার সোনামনিকে ঠিকই নিয়ে যেতে পারবো। ছটফট করছে আজিম। কপালে হাত বুলায় মা। আর একটু ধৈর্য্য ধর বাবা, এইতো সামনেই ঢাকা মেডিকেল। শেরাটনের সামনে আবারও থমকে যায় গাড়ীর চাকা। ট্রাফিক পুলিশের কঠিন হাত উত্তোলিত। সামনের রাস্তা পুরোটাই ফাঁকা। তবুও কেন থামানো হলো গাড়ী। জিজ্ঞাসা করতেই ট্রাফিক পুলিশ জবাব ভি.আই.পি যাবেন, এখন ছাড়া যাবেনা। আর যেন পারছে না আজিম। বার বার মায়ের বুকে লুকাতে চাচ্ছে। মা, আবার কি হলো। নিষ্ফলক দৃষ্টিতে ছেলেকে জড়িয়ে বলে, ভি.আই.পি যাচ্ছে বাবা। ও ভি.আই.পি যাচ্ছে, অস্ফুট আওয়াজ আজিমের। আমি তো গত ইলেকশনে এ দলকেই ভোট দিয়েছিলাম মা। তাহলে একটু বলনা আমাকে যেতে দিতে। আমার যে অনেক কষ্ট হচ্ছে মা, একটু বুঝিয়ে বলো না।

পশ্চিমাকাশে লাল আভা ছড়িয়ে ঢলে পড়ছে লাল সূর্য্যটা। মায়ের মুখে কোন শব্দ নেই, নিষ্ফল চাহনি চোখে। এক অজানা আশংকায় কেপে উঠে বুকটা। হুইসেল বাজিয়ে চলে যায় ভি.আই.পি। হঠাৎ আজিম তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে জাপটে ধরে মাকে। মা আমাকে বাচাঁও মা।

গাড়ী চলছে আবার। কিন্তু আজিমের সচল দেহ ইতোমধ্যেই অচল হয়ে গেছে। মায়ের বুকে আর আজিমের নি:শ্বাস পড়ছে না। নিথর হয়ে পড়েছে আমি। শাহবাগ মোড় পাড় হওয়ার পর অস্ফুট কন্ঠে মা এ্যাম্বুলেন্স চালককে বললেন, গাড়ী ঘোরাও ড্রাইভার। সিরাজগঞ্জ চলো। আমার আজিম এখন ওর বাবার পাশে ঘুমাবে।

আরও পড়ুন :মিথ্যে ভালো থাকা

কবিতার গল্প

অপরাজিতা (মিষ্টি প্রেমের গল্প)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়