সাকিলের স্বপ্ন

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : শনিবার, এপ্রিল ২০, ২০১৯ ৯:২৮:২৯ অপরাহ্ণ
Rana Plaza
ছবি: প্রতিকী

সাকিলের স্বপ্ন
মাহ্‌মুদুন্নবী জ্যোতি

প্রতিদিনের মত সেদিনও সকাল দশটার সময় দোকান খুলেছে সাকিল। সাভার বাসষ্ট্যান্ডের কাছে ছ্ট্রো একটি দোকান। এলাকাটিতে প্রায় দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই কর্মজীবী মানুষ কর্মব্যস্ত থাকে। যে কারণে গভীর রাত অবধি দোকান খোলা রাখতে হয় কিছু বাড়তি আয়ের জন্য। দোকানের ঝাপ খুলে ঝাড়– দিয়ে গোলাপ জল ছিটিয়ে, আগরবাতি জ্বালিয়ে যায় হোটেলে নাস্তা খেতে। দুপুরে আর রাতে বাটির ভাত কিনে খায় সাকিল। রাজনৈতিক দলের হরতাল হলেও সাকিলের দোকানের কাষ্টমার মোটামুটি সকাল থেকেই লেগে থাকে। তাছাড়া এ এলাকায় সারাক্ষণই থাকে কর্মচাঞ্চল্যতা। পাশের সুউচ্চ ভবনের গার্মেন্টসগুলোতেও কাজ চলেছ পুরোদমে। রাস্তায় যানজট না লাগলেও এখনি লাগবে বলে মনে হয়।

সাকিলের দোকানের বিক্রিত পণ্য বলতে ছোট ছোট বিস্কুটের প্যাকেট, বোয়ামে কমদামি বিস্কুট, চানাচুর, চিপস, পাওরুটি, চকলেট, চুইংগাম, ছোট বাচ্চাদের কমদামি খেলনা, তামাকজাত পণ্য, পান আর কেটলিতে চা। চা-ই বেশি চলে এখানে। মূলত নি¤œ আয়ের মানুষগুলোই ওর দোকানের খরিদ্দার। বিশেষ করে গার্মেন্টেসের শ্রমিকরা। দোকানদারি করতে করতে এখানকার অনেকের সাথেই সাকিলের বেশ ভাব জমে গেছে। গার্মেন্টেসের মেয়েরা ওকে ভাই বলে ডাকে। সাকিলও ওদের নিজের স্বজনের মতোই ভাবে। আজ দুপুরে শাহানা এসেছিল দোকানে। বলে ভাইজান, আমার দেড় বছরের ছেলে রবিনের জন্য একটা চরকি খেলনা দাও। বাড়িতে থাকে মায়ের সাথে। মা’রও তো কাজ আছে। মাথার উপর ঝুলিয়ে রাখলে একা একাই খেলা করবে। ভারি মিষ্টি মেয়ে শাহানা। কথায় মনে হয়, ঐ বাচ্চাটার জন্যই গার্মেন্টেসে কাজ করে একটু ভালোভাবে সন্তানকে মানুষ করার আশায়। এ রকম অনেকের সাথেই প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়। নিজের কথা, সংসারের কথা, ছেলে মেয়েদের কথা গল্প করে ওরা। দেখে মনে হয়, সবাই যেন এক পরিবারের সদস্য। সাকিল এখনো বিয়ে করেনি জেনে অনেকেই হাসি ঠাট্রা করে। গতকালও শেফালী, ছালমা, অঞ্জলী, রূপা, আনোয়ার, মোখলেছ দোকানে এসে বেশ খেপিয়ে গেছে। বলে কিনা ওদের হাতে পাত্রি আছে, ভালো পাত্রি, বললে কালই বিয়ে পড়িয়ে দেবে। ওদের দুষ্টুমি সাকিলও বেশ উপভোগ করে।

স্বপ্না। সামনের রানা প্লাজার সাত তলায় গার্মেন্টেসে চাকুরি করে। শ্যামলা গড়ন। লাজুক স্বভাবের মেয়ে। সাকিলের দোকানের সামনে দিয়ে প্রতিদিন কাজে যাওয়ার সুবাদেই দেখা, পরিচয়। ভালোলাগা বা ভালবাসা বোঝে না। শুধু এটুকু বোঝে, ওরা একে অপরকে বিয়ে করবে। শান্ত স্বভাবের সাকিল প্রতিদিন বিকেলে গার্মেন্টেস ছুটির পর স্বপ্নার অপেক্ষায় থাকে। বিষয়টি স্বপ্নাও জানে, একদিন না দেখলে সাকিল কেমন যেন অস্থির হয়ে যায়। প্রতিদিন শত শত কাপ চা বিক্রি করলেও বিকেলে স্বপ্নার সাথে এক কাপ চা খাওয়ার জন্য মনটা কেমন যেন উদগ্রীব হয়ে থাকে সাকিলের। তাইতো প্রতিদিন যাবার সময় দোকানের সামনে একটি মুহুর্তের জন্য হলেও দেখা করে যায় স্বপ্না।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। গার্মেন্টেস ছুটি হয়েছে। অপেক্ষা করতে থাকে সাকিল। ধীর পায়ে সাকিলের দোকানের সামনের বেঞ্চে এসে বসে স্বপ্না। পরনে হলুদ রংয়ের সালোয়ার কামিজ। সাদা মাঠা সাজ। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে ক্লান্ত দেখালেও মনের মানুষের সামনে এসে যেন কোমনীয়তা ফিরে পায় স্বপ্না।
কেমন আছো স্বপ্ন?
আপনি আমারে আবারো স্বপ্ন বললেন?
হ্যাঁ, আমি তোমাকে স্বপ্ন বলেই ডাকবো। কারণ, যাকে আমি প্রতিরাতেই স্বপ্নে দেখি। আর দিনে বেলায় বিয়া কইরা ঘর বাঁধবো কবে সেই স্বপ্নে বিভোর থাকি, সে তো স্বপ্না না, আমার স্বপ্ন।
লাজুক স্বপ্না মাথাটা নীচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, তা আপনার ‘স্বপ্না’কে নিয়ে ‘স্বপ্ন’ পূরণ করছেন কবে?
বেশি দেরি নাই। মারে খবর দিছি। বলছি ছোট বোনের বিয়া ঠিক করতে। একটা ছেলেও পাওয়া গেছে। খুব শীঘ্রই বিয়া দিব। আর ছোট বোনডারে বিয়া দিয়াই আমরা-বলেই দুষ্টমি হাসি হাসতে থাকে সাকিল।
ছোট বোনের প্রতি সাকিলের দায়িত্বজ্ঞান দেখে খুশিই হয় স্বপ্না। কথার ফাঁকে সাকিল নিজ হাতে পরম যতেœ চা বানিয়ে স্বপ্নার হাতে দিতে দিতে বলল, বিয়ের পর কিন্তু তুমি ঘরে চা বানাবা, আমি খাবো।
লাজুক রাঙ্গা মুখ লজ্জায় আরো লাল হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বলল, আমি তো আপনার মত এত ভালো চা বানাতে পারি না।
সাকিল সহাস্যে উত্তর দেয়, কোন চিন্তা নাই, আমি শিখায় দিব।
ঠোঁট যুগল কাপের স্পর্শ পাচ্ছে, আর হৃদয়ের স্পর্শে ওরা আন্দোলিত হচ্ছে এক অজানা অনুভূতিতে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমি এখন যাই-বলেই ওঠতে যায় স্বপ্না।
একটু দাঁড়াও-বলেই হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে সাকিল বলল-এবার যাও।
স্বপ্না বাসায় ফিরেই প্যাকেটটা খুলে দেখে লাল রংয়ের একটা সালোয়ার কামিজ। সাথে কাঁচের চুড়ি আর লাল ফিতা। বড় ভাগ্যবতী মনে করে স্বপ্না নিজেকে। ছোট বেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাপ দ্বিতীয় বিয়ে করে। তারপর থেকেই ছোট্ট স্বপ্না জীবনের সংগ্রামী পথে একই চলতে শুরু করেছে। জীবনটাকে শুধু যন্ত্রণা আর কষ্টের মনে হতো সারাক্ষণ। আপনজন বলতে কেউ কাছে নেই। সাত বছর ধরে গার্মেন্টেসে কাজ করছে সেই তের বছর বয়স থেকে। মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটেছে কম সময়ই। আজ নিজেকে অনেক বেশি সুখি মনে হচ্ছে। নিজের মনে ভাবতে থাকে, কালকে এই কাপড়টাই পড়ে যাবো। চুল বাঁধবো ওর দেয়া ফিতায়। চুড়ি পড়ে কাজ করতে অসুবিধা হবে, তাই চুড়িগুলো ব্যাগে করে নিয়ে যাবো। ফেরার সময় পথে পড়ে নিব। আর এ সাজে দেখলে ও নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে।

সকাল সাড়ে নয়টা কি পৌনে দশটা বাজে। প্রথমে একটা আওয়াজ, এর পর চারিদিকে শুধু চিৎকার, হৈ চৈ আর করুণ আর্তনাত। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সাকিল। দোকানের পশ্চিম পার্শের ৯তলা ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ছে। ভিতর থেকে শুধু বাঁচাও বাঁচাও বলে নারী-পুরুষের করুণ আর্তনাত। মূর্তিমান পাথরের মত হয়ে যায় সাকিল কিছু সময়ের জন্য। পরক্ষণেই আসে-পাশের সবাইকে নিয়ে যায় ভবনের কাছে। ধসে পড়া ভবনের ফাঁক ফোকর দিয়ে যাকে যেভাবে পারছে উদ্ধার করছে। খাওয়া-দাওয়া ভুলে উদ্ধারকর্মীদের সাথে একাত্ম হয়ে একের পর এক উদ্ধার করছে পরম যতেœ জীবিত শ্রমিককে, কখনোও বা আবার নিষ্প্রাণ দেহকে। কান্নাও ভুলে গেছে সাকিল। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত একটানা তিন দিন কীভাবে কেটে গেছে টেরই পায়নি। তবুও তাঁকে এখনো খুঁজে পায়নি সাকিল। উদ্ভ্রান্তের মত ছুঁটছে। উদ্ধারকর্মী অনেকেই মনে করেছে হয়তো নিজের কোনো আপনজন খুঁজে বেড়াচ্ছে ছেলেটি। হ্যাঁ, সাকিল তার আপনজনকেই খুুঁজে বেড়াচ্ছে। এত এত মানুষ উদ্ধার করছে সাকিল কিন্তু তাঁকে পাচ্ছে না। তিন দিন পাড় হয়েছে। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। আর একটু পরই নেমে আসবে সন্ধ্যা। ক্লান্ত, শ্রান্ত, দুর্বল সাকিল রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে ধীর পায়ে। এতদিন ওর চোখের পানি ছিল না। অনেকেই হয়ত ভেবেছিল সাকিলের চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আজ ওর দু’চোখে গড়িয়ে পড়ছে পানির স্রোতধারা। কোলে একটি মেয়ের লাশ। লাল সালোয়ার কামিজ পড়া, মাথায় লাল ফিতায় চুল বাঁধা। নিজের সকল শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে পচনধরা লাশটাকে, যাতে কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে।

চারিদিক পরিপাটি, সুন্দর বিছানায় শুয়ে আছে সাকিল। পাশের নার্স বলে উঠলো ২১১ এর রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার নার্স ঘিরে ফেলে। বুঝতে পারে ওর বেড নম্বর ২১১। কীভাবে জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে আসতে হয়েছে মনে করতে পারে না। ডাক্তার নার্স কিছু উপদেশ দিয়ে চলে যায়। উপরে ফ্যান ঘুরছে তবুও ঘাম কমছে না। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে সাকিল।

কুড়িগ্রামের নিভৃত গ্রামে নিজ পরিবারের ভরণ পোষন মেটাতে না পেরে ঢাকায় আসেন ভূমিহীন কৃষক বাবা কাজের সন্ধ্যানে। পেয়েও যায় গার্মেন্টেসে চাকুরি। দিনে গার্মেন্টেসে কাজ করতো আর রাতে বিভিন্ন দোকানে ফরমায়েশের কাজ করে পেত কিছু বাড়তি টাকা। তা দিয়েই চলত সংসার কোনো রকমে। ২০০৪ সালে একদিন হঠাৎ বাড়ি থেকে খবর পায় একটি অনেকতলা গার্মেন্টেসের বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়েছে। নাম স্পেকটার্ম। মা নাম না জানলেও সাকিল জানতো বাবার ঠিকানা। পাগলের মত ছুটে আসে সাভারের বাইপাইলে। কিন্তু আমার বাবা কোথায়। সারা বিল্ডিং খুঁজে বাবার সন্ধান পায়নি। দুইদিন পর উদ্ধার হয় বাবার নিথর দেহ। চিনতে কষ্ট হয় লাশ দেখে। জমিতে কাজ করতে কোদালের কোপের চিহ্ন দেখে সনাক্ত করা হয় বাবাকে। নাবালক তিন সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় মায়ের সংগ্রামী জীবন। অন্যের বাড়িতে, কখনো ধানের চাতালে কাজ করে সংসারের হাল ধরেন মা। বাবা মারা যাওয়ার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। ছাত্র হিসেবে অতটা ভালো হলেও পড়াশোনার প্রতি প্রচ- আগ্রহ ছিল সাকিলের।

মায়ের কষ্ট দেখে একদিন বাবার মত সাকিল ঢাকার দিকে যাত্রা করে। তবে মায়ের শর্ত ছিল গার্মেন্টেসে চাকুরি করতে পারবে না। বাবার পূর্ব পরিচিত ছলিম চাচা। ঐ দয়ার্ত মানুষটির কল্যাণেই এই দোকান। মাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। মাকে স্বপ্নার কথা বলেছে। আরো বলেছে বিয়ে করার পর মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে সাভারে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকবে। লোনা পানির স্রোত বইতে শুরু করে চোখ দুটিতে। মায়ের কথামত গার্মেন্টেসের কাজে যায়নি সাকিল। তবুও জীবনের এতবড় একটা ‘স্বপ্ন’ কেড়ে নিল রানা প্লাজা। যাকে বউ করে ঘরে তুলে নিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার নিষ্প্রাণ দেহ কোলে তুলে নিতে হলো শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দেবার জন্য।

আরও পড়ুন: অপরাজিতা (মিষ্টি প্রেমের গল্প)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়