সাহিত্য ভাবনায় তথ্য ও তত্ত্ব

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২২ ১১:০৯:১৯ অপরাহ্ণ

পারভীন আকতার :
‘সহিত’ শব্দ থেকে সাহিত্য কথাটির সৃষ্টি । জগৎ ও জীবনের বিচিত্র ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে মনের যে নিবিড় অনুভূতি রস সমৃদ্ধ হয়ে বাণীরূপ লাভ করে, তাই সাহিত্য । অন্য কথায়, মানুষের আনন্দ-বেদনার বিচিত্র অনুভূতির শিল্পময় প্রকাশই হল সাহিত্য । সাহিত্য বলতে যথাসম্ভব কোন লিখিত বিষয়বস্তুকে বুঝায়। সাহিত্য শিল্পের একটি অংশ বলে বিবেচিত হয়, অথবা এমন কোন লেখনি যেখানে শিল্পের বা বুদ্ধিমত্তার আঁচ পাওয়া যায়, অথবা যা বিশেষ কোন প্রকারে সাধারণ লেখনি থেকে আলাদা৷ মোটকথা ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য্য ও শিল্পের লিখিত বা লেখকের বাস্তব জীবনের অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্য। ধরন অনুযায়ী সাহিত্যকে কল্পকাহিনি বা বাস্তব কাহিনি কিম্বা পদ্য, গদ্য এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। পদ্যের মধ্যে ছড়া, কবিতা ইত্যাদি, গদ্যের মধ্যে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এছাড়াও অনেকে নাটককে আলাদা প্রধান শাখা হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করেন। নাটকের মধ্যে নাটিকা, মঞ্চনাটক ইত্যাদিকে ভুক্ত করা যায়।

সাহিত্য তত্ত্বঃ
১. ডায়াসপোরা সাহিত্য (Diaspora Literature ):
ডায়াসপোরা পরিস্থিতিতে বাস করেছেন অর্থাৎ কোনো কারণে নির্বাসনে থেকে বা জীবিকার অণ্নেষণে নিজ দেশ ছেড়ে ভিনদেশে বাস করেছেন এমন পরিস্থিতিতে কোনো লেখক যে সৃজনশীল সাহিত্য রচনা করেন সেটি ডায়াসপোরা সাহিত্য।

২. নারীবাদ সাহিত্য তত্ত্ব (Feminist Literary Theory) :
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাতে যে সকল সাহিত্যকর্ম অর্থাৎ নাটক, সিনেমা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রেখেছে সেগুলোই এর আলোচ্য বিষয়।

৩. মনঃসমীক্ষাবাদী সাহিত্য তত্ত্ব (Psycho-Analytical Literary Theory):
মনঃসমীক্ষাবাদী সাহিত্য তত্ত্ব হলো ফ্রয়েড সে সাইকো-এনালিসিস শরু করেছিলেন এবং তার উত্তরসূরী মনস্তাত্ত্বিকরা যেভাবে সেটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তার আলোকে একটি লিটারেরি টেক্সট বা সাহিত্যকর্মকে বিশ্লেষণ করা। মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের পেছনে অবচেতনের বিরাট ভূমিকা আছে বলে মনে করা হয়। এই সাহিত্যতত্ত্বে সেই ভূমিকাটা আবিষ্কার এবং বিশ্লেষণ করা হয়।

৪. লেখক-জীবনীভিত্তিক সাহিত্য তত্ত্ব (Biographical Literary Theory):
লেখার সঙ্গে লেখকের যে সম্পর্ক সেটি এই সাহিত্য তত্ত্বের আলোচ্য বিষয়। অর্থাৎ সৃজনশীল লেখায়, সেটি গদ্যপদ্য উভয় ক্ষেত্রেই, লেখকের আত্মজৈবনিক যে উপাদান থাকে তার আলোকে লেখাকে বিশ্লেষণ করার ধারাকে লেখক-জীবনীভিত্তিক সাহিত্য তত্ত্ব বলে।

৫. ঐতিহাসিক সাহিত্য তত্ত্ব (Historical Literary Theory ):
কোনো সাহিত্যকর্মকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা ঐতিহাসিক তত্ত্ব উপাত্তের মাধ্যমে বিচার-বিশ্লেষণ করা এই সাহিত্যতত্ত্বের আওতায় পড়ে। কোন সময়ে, কোন প্রেক্ষাপটে, কোন সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সাহিত্যকর্ম রচিত, সে প্রসঙ্গে এখানে আলোচিত হয়। এটা ফর্মাল ক্রিটিসিজমের আওতাভুক্ত।

৬. অস্তিত্ববাদ সাহিত্য তত্ত্ব (Existential Literary Theory) :
দার্শনিক ও সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু বলেছেন, প্রতিটা মানুষ একা। তাকে একটা অপরিচিতি পৃথিবীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এই পৃথিবীর নিজস্ব কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই। শূন্য থেকে আসা সেই ব্যক্তির শূন্যের দিকে যে যাত্রাপথ সেই যাত্রাপথে সে একটা অর্থহীন বা অ্যাবসার্ড জীবন আবিষ্কার করে। এই দার্শনিক ভিত্তির ওপর আলোকপাত করে সাহিত্য বিশ্লেষণ পদ্ধতি হলো অস্তিত্ববাদ সাহিত্যতত্ত্ব।

৭. পাঠক-প্রতিক্রিয়া সাহিত্য তত্ত্ব (Reader-Response Literary Theory):
এই সাহিত্য তত্ত্বের প্রধান বিষয় হলো, কোনো বিশেষ সাহিত্যকর্মের পাঠককর্তৃক অর্থ উদ্ধার করা। এক্ষেত্রে একজন পাঠকের জ্ঞান, বোধ ও পঠন-পাঠনের ওপর নির্ভর করে সাহিত্যকর্মটির বিশ্লেষণ কেমন হবে।

৮. মার্কসীয় সাহিত্য তত্ত্ব (Marxist Literary Theory):
এই সাহিত্য তত্ত্বের কাজ হলো, সাহিত্যে বর্ণিত সমাজব্যবস্থায় কোন শাসন-কাঠামো বিদ্যমান, শ্রেণিবৈষম্য আছে কিনা, উৎপাদন ব্যবস্থা কেমন, সম্পদের সুষম বন্টন আছে কিনা, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক কোন ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, ভাষাটা কোন শ্রেণির এসব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা।

৯. উত্তর-উপনিবেশবাদ সাহিত্য তত্ত্ব (Post-Colonial Literary Theory):
উত্তর উপনিবেশিক সাহিত্য হলো সেই সব সাহিত্যকর্ম যা ইউরোপিয়ানদের এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং প্যাসিফিক অঞ্চলে উপনিবেশিক সময়ে বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা তুলে ধরে। উত্তর- উপনিবেশবাদ সাহিত্য তত্ত্ব উপনিবেশকালের নানা সমস্যা ও উপনিবেশ উত্তরকালের প্রভাবগুলো উপস্থাপন করে।

১০. প্রকৃতিবাদ সাহিত্য সমালোচনা (Eco-criticism):
একটা টেক্সট বা সাহিত্যকর্মে পরিবেশগত বিষয়াদি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সেটি এই সাহিত্যতত্ত্বে আলোচনা করা হয়। একটি উপন্যাসের প্লটে ফিজিক্যাল সেটিং বা বাহ্যিক জগত কীভাবে এসেছে, চরিত্রগুলো পরিবেশ বিষয়ে কতটা সচেতন, চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিবেশের কি সম্পর্ক ও প্রভাব এসব বিষয়াদি উঠে আসে এই তাত্ত্বিক আলোচনায়।

১১. বিন্যাস (Plot) :
একটা গল্পে যে ঘটনাগুলো থাকে তার পর্যায়ক্রমিক উপস্থাপনকে প্লট বা বিন্যাস বলে। অর্থাৎ প্লট মানে কাহিনি নয়, কাহিনির বিন্যাস। যেমনঃ রাজা মারা গেল এবং তারপর রানী মারা গেল — এটা গল্প। আর রাজা মারা গেল, সেই শোকে মারা গেল রানীও –এটা হলো প্লট।

১২. পটভূমি (Setting)
শিল্প বা সাহিত্যে বিষয়বস্তুর সময়কাল ও স্থানকে সেটিং বা পটভূমি বলে। কিংবা গল্পের সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সেটিং বলা যেতে পারে। অর্থাৎ কখন, কোথায় এবং কোন প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি ঘটলো সেটিই এখানে বিবেচ্য বিষয়।

লেখক : শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক

জনপ্রিয়