হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (শেষ পর্ব)

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : রবিবার, মে ১৯, ২০১৯ ৩:৫৭:৩৪ অপরাহ্ণ
Mohammad s.
হজরত মোহাম্মদ স. এর রওজা পাকের প্রধান ফটক। ছবি : সংগৃহীত

মাহমুদুন্নবী জ্যোতি:
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে চলমান বার্তার সম্মানিত পাঠকদের জন্য মহানবী সা. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ রয়েছে এর শেষ পর্ব। এ পর্বে রয়েছে নবী স. এর পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তের অজানা কিছু তথ্য। চলুন তাহলে দেখি, শেষ পর্বে আর কী আছে।

কিয়াসের উৎপত্তি:
ইয়ামান এলাকা বিজিত হওয়ার পর সাহাবী হযরত মাআয ইবনে জাবাল রা. কে উক্ত এলাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। যাত্রার প্রাক্কালে রাসুলুল্লাহ সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কিসের ভিত্তিতে দেশ শাসন করবে? জবাব দিলেন, “আল্লাহর কিতাবের ভিত্তিতে”। প্রশ্ন করা হলো, যদি বিশেষ কোন ঘটনার ক্ষেত্রে কোরআনে সুষ্পষ্ট কোন সমাধান না পাও তবে? উত্তর দিলেন, “হাদীসে তা অনুসন্ধান করব”। পুণরায় প্রশ্ন করা হলো, ‘যদি হাদীসেও বিশেষ কোন একটা সমস্যার সমাধান খুঁজে না পাও, তবে?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘তখন আমি কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার আলোকে কিয়াসের মাধ্যমে সে সমস্যার সমাধান করব’। রাসুলুল্লাহ সা. মাআযের এ জবাবে সন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং নতুন নতুন সমস্যাদির সমাধান অনুসন্ধানে কোরআন ও হাদীসের আলোকে কিয়াস করার রীতি অনুমোদন করলেন। এভাবেই ‘কিয়াস’ শরীয়তের একটি দলীলরূপে স্বীকৃতি লাভ করে।

প্রথম ঈদের নামাজ:
হিজরী দ্বিতীয় সালে রোজা ফরজ হয়। এ বছরই রোজার পর মসজিদে নববীর অদূরে, বাসগৃহ থেকে হাজার গজ পশ্চিমে খোলা জায়গায় ঈদের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সা. জামাতের ইমামতি করেন। পরবর্তীতে সেখানে ‘মাসজিদুল গামামা’ নামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে।

প্রথম জুমার নামাজ:
হিজরতের পূর্বে জুমার নামাজের আদেশ নাজিল হলেও মক্কাবাসীর বৈরী আচরণের কারণে জুমার নামাজ আদায় করা সম্ভব হয়নি। ১ম হিজরীর ১২ই রবিউল আওয়াল, (হিজরতের চৌদ্দদিন পর) ৬২২ খৃষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখ শুক্রবার বনী সালেমের পল্লীতে নবী করীম সা. জুমার নামাজ আদায় করেন। এটাই নবী করীম সা. এর ইমামতিতে প্রথম জুমার নামাজ ও নিয়মিত পড়ার সূচনা। প্রথম জুমার জামাতে একশ জন সাহাবী শরীক হয়েছিলেন। যে স্থানটিতে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করা হয়েছিল সেখানে পরবর্তিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে, যা “মাজিদুল জুমুয়া” নামে খ্যাত।

হজ ও বিদায় হজ:
নবুওয়ত প্রাপ্তির আগে হযরত নবী করীম সা. অনেকবার হজ করেছেন। তবে তা করেছেন তদানীন্তন আরব রীতি অনুযায়ী। আর ইসলামের পরিশুদ্ধ রীতি অনুযায়ী হজ একবারই করেছেন হিজরী দশম সনে অর্থাৎ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার তিন মাস পূর্বে যা বিদায় হজ নামে পরিচিত। ইসলামের রীতি অনুযায়ী সম্পাদিত এ হজকেই উম্মতের জন্য অনুসরণীয় সাব্যস্ত করে গেছেন।
বিদায় হজে প্রিয় নবীজি লক্ষাধিক সাহাবীদের উপস্থিতিতে যে অমূল্য ভাষণ প্রদান করেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির মুক্তিসনদ হিসেবে বিবেচিত হবে। আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের শীর্ষদেশে কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর পীঠে বসে তিনি আবেগ জড়ির কন্ঠে বলেন:
– মানুষ সকল। আমার ধারণা যে, আজকের এ সমাবেশের পর এরূপ জমায়েতে তোমাদের সাথে আমি আর একত্রিত হবো না।
– স্মরণ রেখো, তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের মানসম্ভ্রম পরস্পরের নিকট ততটুকুই পবিত্র, যতটুকু পবিত্র আজকের এ (আরাফার) দিন। আজকের এই যিলহজ মাস এবং এই (পবিত্র মক্কা) নগরী।
– শেষ পর্যন্ত একদিন তোমাদেরকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সমীপে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে তোমাদের কৃতকর্মের হিসেব করা হবে। সাবধান! আমার পর বিভ্রান্ত হয়ে যেন একে অপরের মস্তক কর্তন করতে শুরু করো না।
– তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহর নামে শপথ করে তাদেরকে নিজেদের জন্য হালাল করেছ। স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার, তারা অপরকে সঙ্গসুখ প্রদান করতে পারবে না। যদি তাদের কেউ এরূপ অপরাধ করে, তবে এতটুকু শাস্তি প্রদান করতে পার যা প্রকাশ না পায়। আর তোমাদের উপর স্ত্রীদের অধিকার হচ্ছে, যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তাদের ভরণপোষণ করতে হবে।
– তোমাদের দাসদাসী এবং অধিনস্তদের অধিকার সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। যা তোমরা খাবে, তাদেরকেও তাই খেতে দিবে। যা পরবে, তাদেরকেও তাই পরতে দিবে।
– আজ আমি বর্বর যুগের সকল প্রথা পদদলিত করছি। বিগত যুগের সকল হত্যা সম্পর্কিত ঝগড়া-বিবাদের সমাপ্তি ঘোষণা করছি। …..জাহেলিয়াত যুগের সরল সুদের দাবি বাতিল ঘোষণা করছি। স্মরণ রেখো, স্বয়ং আল্লাহ প্রত্যেক হকদারের অধিকারের সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। সুতরাং বৈধ উত্তরাধিকারীদের কারও জন্য অতিরিক্ত কোন ওসিয়্যত করার প্রয়োজন নেই। সন্তান যার ঔরস থেকে জন্মলাভ করে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুর শাস্তি। আর এ দুস্কর্মের জবাবদিহি আল্লাহর নিকট করতে হবে। যে সন্তান নিজের পিতা ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির সাথে নিজের বংশ পরিচয় সংযুক্ত করে, তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে। স্ত্রীরা যেন অনুমতি ব্যতীত স্বামীর সম্পদ ব্যয় না করে। ঋণ সর্বাবস্থায়ই পরিশোধ যোগ্য। ধার করা বস্তু ফেরত দিতে হবে। উপহারের প্রতিদান দেয়া উচিত। জরিমানার ক্ষেত্রে জামিনদারও দায়ি হবে।
– লোক সকল, তোমাদের সকলের আল্লাহ এক। তোমাদের সকলের আদি পিতাও এক ব্যক্তি। সুতরাং কোন আরব অনারবের উপর, কোন কৃষ্ণাঙ্গের সাদার উপর, কোন সাদার কৃষ্ণাঙ্গের উপর কোন প্রকার জন্মগত প্রাধান্য নেই। সম্মানী সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহভীরু। প্রত্যেক মুসলমান একে অন্যের ভাই। আর সমগ্র বিশ্ব মুসলিম মিলে এক মহাজাতি।
– তোমাদের জন্য আমি এমন একটা মহামূল্যবান বস্তু রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রাখ, তবে তোমরা কখনও বিভ্রান্ত হবে না। ঐ বস্তুটি হচ্ছে আল্লাহর কোরআন।
– শোন, আমার পর আর কোন নবী আসবে না। নতুন কোন উম্মতেরও সৃষ্টি হবে না। তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সম্পর্কে দৃঢ় থেকো। রমজানের রোজা রেখো। হৃষ্টচিত্তে মালের জাকাত প্রদান করো। আল্লাহর ঘরে হজ করতে যেয়ো। তোমাদের শাসনকর্তাদের নির্দেশ মান্য করো এবং আল্লাহর বেহেশতে স্থানলাভ করার যোগ্যতা অর্জন করো।
– যারা আজ এখানে উপস্থিত আছ, তারা অনুপস্থিতদের মধ্যে আমার বাণী পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করো। (সংক্ষিপ্তকারে তুলে ধরা হলো)

নবীজির মসজিদের শেষ নামাজ:
নবীজি ওফাতের দুইদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ রবিউল আওয়াল শনিবার জোহরের নামাজ মসজিদে আদায় করেন। অসুস্থতার জন্য তিনি দুই জনের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে তাশরীফ আনেন। এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ইমামতি করেন। নবীজির বিদায়ের চারদিন পূর্বে বৃহস্পতিবার এশার নামাজ থেকে মোট সতের ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.।

ওফাত:
হিজরী ১১ সনের ১২ই রবিউল আওয়াল, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন সোমবার আনুমানিক বেলা ১১ ঘটিকার সময় হযরত মোহাম্মদ সা. সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে কাঁদিয়ে তাঁর পার্থিব জীবন শেষ করেন।

জানাযা:
নবী পাকের কোন আনুষ্ঠানিক জানাযা হয়নি। ওফাতের আগে প্রদত্ত নির্দেশ অনযায়ী পবিত্র দেহ মোবারক গোসল ও কাফন পরানোর পর হুজরার মধ্যে রাখা হয়েছিল। লোকেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হুজরায় ভেতর প্রবেশ এবং প্রত্যেকেই নিজে নিজে ছালাত ও সালাম পেশ করেন। এভাবে মদীনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ত্রিশ হাজার লোক জানাযা পাঠ করেন।

কবর খনন:
কবর খনন করেছিলেন হযরত আবু তালহা আনসারী রা.।

দেহ মোবারক করবে অবতরণ:
১৪ই রবিউল আওয়াল বুধবার মাগরিবের পূর্বে, ওফাতের আনুমানিক ৭২ ঘন্টা পর নবীজির পরিত্র দেহ মোবারক কবরে অবতরণ করা হয়। এতে অংশ নেন হযরত আলী রা., হযরত আব্বাস রা. এবং তাঁর ছেলে ফজল ও কাসাম রা.।

আরও পড়ুন >>

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (১ম পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (২য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৩য় পর্ব)

মহানবী হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৪র্থ পর্ব)

হযরত মোহাম্মদ স. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (৫ম পর্ব)

(এর পর শুরু হবে সাহাবা আজমাঈনদের নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। চোখ রাখুন চলমান বার্তায়)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

জনপ্রিয়